August 30, 2025

The New Nation | Bangla Version

Bangladesh’s oldest English daily newspaper bangla online version

Friday, August 29th, 2025, 5:40 pm

রোহিঙ্গাদের জাহাজে তুলে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে ভারত

 

ভারতের নৌবাহিনী তাদের জাহাজে তুলে মিয়ানমারের নিপীড়িত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যদের সমুদ্রে ফেলে দিচ্ছে। এমনই অভিযোগ করেছেন ৪০ জন রোহিঙ্গা শরণার্থী। তাদের অভিযোগ, রাজধানী দিল্লি থেকে আটক করে নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে সাগরে ফেলে দেওয়া হয় তাদের।

শরণার্থীরা মিয়ানমারে ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। জাতিসংঘ বলেছে, ভারতের এই পদক্ষেপে রোহিঙ্গাদের জীবন ‘চরম ঝুঁকির’ মধ্যে পড়েছে। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি শুক্রবার (২৯ আগস্ট) এ তথ্য প্রকাশ করেছে।

নুরুল আমিন গত ৯ মে ভাইয়ের সঙ্গে শেষবার ফোনে কথা বলেন। সংক্ষিপ্ত সেই ফোনালাপে তিনি জানতে পারেন, তার ভাই খাইরুল এবং পরিবারের আরও চারজনকে ভারতের সরকার মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে। মূলত ওই দেশ থেকে তারা বহু বছর আগে প্রাণ রক্ষার জন্য পালিয়েছিলেন।

শরণার্থীরা এবং দিল্লিতে থাকা তাদের স্বজনদের ভাষ্য, বিশেষজ্ঞদের তদন্ত এবং তথ্য সংগ্রহের মাধ্যমে বিবিসি ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠন করেছে। তথ্য অনুযায়ী, তাদের দিল্লি থেকে বিমানে বঙ্গোপসাগরের একটি দ্বীপে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে নৌবাহিনীর জাহাজে তুলে শেষে আন্দামান সাগরে ফেলে দেওয়া হয়। পরে তারা সাঁতরে তীরে ওঠেন। এখন তারা মিয়ানমারে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি।

মিয়ানমারে বর্তমানে সেনা অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ২০২১ সালে ক্ষমতা দখলকারী জান্তার বিরুদ্ধে জাতিগত গোষ্ঠী ও প্রতিরোধ বাহিনী লড়াই করছে। এমন পরিস্থিতিতে আমিনের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের সম্ভাবনা প্রায় নেই। দিল্লিতে বসে ২৪ বছর বয়সী আমিন বলেন, ‘আমার বাবা-মা ও স্বজনেরা কী যন্ত্রণার মধ্যে আছেন, তা কল্পনাও করতে পারিনি।’

তাদের দিল্লি থেকে সরানোর তিন মাস পর বিবিসি মিয়ানমারে ওই রোহিঙ্গাদের খুঁজে পায়। বেশিরভাগই আশ্রয় নিয়েছেন বাহটু আর্মি (বিএইচএ)-এর কাছে, যারা দক্ষিণ-পশ্চিম মিয়ানমারে জান্তার সেনাদের বিরুদ্ধে লড়ছে। ভিডিও কলে সৈয়দ নূর বলেন, ‘আমরা এখানে নিরাপদ নই। পুরো এলাকা যেন যুদ্ধক্ষেত্র।’ তার সঙ্গে আরও ছয়জন রোহিঙ্গা ওই কাঠের আশ্রয়ে ছিলেন।

জন নামে একজন রোহিঙ্গা ফোনে তার ভাইকে বলেন, ‘আমাদের হাত বেঁধে, চোখ-মুখ ঢেকে বন্দির মতো জাহাজে তোলা হলো। তারপর সমুদ্রে ফেলে দিল।’ নুরুল আমিন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘মানুষকে কীভাবে এভাবে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া যায়? মানবতা পৃথিবীতে এখনও বেঁচে আছে, কিন্তু ভারতের সরকারের মধ্যে আমি কোনো মানবতা দেখিনি।’

জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক টমাস অ্যান্ড্রুজ বলেন, এসব অভিযোগ প্রমাণের মতো ‘গুরুত্বপূর্ণ তথ্য’ তার হাতে আছে। তিনি জেনেভায় ভারতের মিশন প্রধানের কাছে এ সংক্রান্ত প্রমাণও জমা দিয়েছেন, তবে কোনো উত্তর পাননি। বিবিসি ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছে, কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি।

 

ভারতে রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ। দেশটি তাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না; বরং ‘অবৈধ অভিবাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করে। বর্তমানে ভারতে ২৩,৮০০ রোহিঙ্গা জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরে নিবন্ধিত, তবে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মতে প্রকৃত সংখ্যা ৪০ হাজারেরও বেশি।

বিবিসি জানায়, ৬ মে দিল্লির বিভিন্ন জায়গায় বসবাসরত ৪০ জন রোহিঙ্গাকে স্থানীয় থানায় ডেকে পাঠানো হয়। বলা হয়, সরকার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী তাদের ছবি ও আঙুলের ছাপ সংগ্রহ করা হবে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাদের শহরের ইন্দরলোক আটক কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

আমিন জানান, সেই সময় তার ভাই ফোন করে জানায় তাদের মিয়ানমারে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে এবং আইনজীবীর সাহায্য নিতে ও ইউএনএইচসিআরকে খবর দিতে বলেন। এরপর ৭ মে হিন্দন বিমানবন্দর থেকে তারা আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছে বাসে করে নিয়ে যাওয়া হয়। বাসগুলোর গায়ে লেখা ছিল ‘ভারতীয় নৌবাহিনী।’

সৈয়দ নূর বলেন, ‘বাসে উঠেই আমাদের হাত প্লাস্টিক দিয়ে বেঁধে ফেলা হয়, মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা দেওয়া হয়।’ কিছুক্ষণের মধ্যেই তাদের নৌবাহিনীর একটি জাহাজে তোলা হয়। বড় যুদ্ধজাহাজটিতে তারা প্রায় ১৪ ঘণ্টা ছিলেন। খাবার হিসেবে দেওয়া হয়েছিল ভাত, ডাল আর পনির।

৪০ জনের মধ্যে ১৫ জন ছিলেন খ্রিস্টান রোহিঙ্গা। নূরের দাবি, তাদের জিজ্ঞেস করা হয়েছিল কেন ইসলাম ছেড়ে খ্রিস্টধর্ম নিয়েছেন, কেন হিন্দু হননি। এমনকি তাদের খতনা হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করা হয়। একজনকে কাশ্মিরের পেহেলগাম হামলায় জড়িত বলেও অভিযুক্ত করা হয়, যদিও প্রমাণ নেই।

৮ মে সন্ধ্যায় তাদের ছোট রাবারের নৌকায় তুলে সমুদ্রে নামতে বাধ্য করা হয়। হাতে লাইফ জ্যাকেট দেওয়া হয়েছিল। বলা হয়েছিল, তারা ইন্দোনেশিয়ায় পৌঁছেছে, কিন্তু আসলে তারা মিয়ানমারের কাছাকাছি। ৯ মে ভোরে স্থানীয় জেলেরা তাদের খুঁজে পান। তাদের ফোন ব্যবহার করতে দেন, এবং তারা ভারতে থাকা স্বজনদের খবর দেন। এরপর থেকে বাহটু আর্মি তাদের খাবার ও আশ্রয় দিচ্ছে।

জাতিসংঘ বলেছে, ভারত রোহিঙ্গাদের আন্দামান সাগরে ফেলে দিয়ে তাদের জীবনকে ‘চরম ঝুঁকিতে’ ফেলেছে।

ভারতের রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকে গা ঢাকা দিয়েছেন, কেউ কেউ আর বাসায় থাকেন না। নুরুল আমিন বলেন, ‘আমার মনে শুধু ভয় কাজ করে — ভারত সরকার যে কোনো সময় আমাদেরও ধরে নিয়ে সমুদ্রে ফেলে দেবে। এখন আমরা ঘর থেকে বের হতেও ভয় পাচ্ছি।’

জাতিসংঘের অ্যান্ড্রুজ বলেন, ‘রোহিঙ্গারা ভারতে থাকতে চায়নি, তারা এসেছে মিয়ানমারের ভয়াবহ সহিংসতা থেকে পালিয়ে। তারা সত্যিই প্রাণ বাঁচাতে ছুটছে।’

এনএনবাংলা/