সুস্থ ও কর্মচঞ্চল অবস্থায় ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে কারাগারে গিয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। কিন্তু ২৫ মাস পর ২০২০ সালের মার্চে সাময়িক মুক্তিতে বাসায় ফিরলেও তিনি আর কখনও হেঁটে চলতে পারেননি। মুক্তির পর থেকেই তাঁকে হুইলচেয়ারে চলাফেরা করতে দেখা গেছে। জীবনের শেষ সাড়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় কেটেছে হাসপাতাল ও চিকিৎসার মধ্যেই।
কারাগারে যাওয়ার সময় ছিলেন সুস্থ
‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে পরিচিত খালেদা জিয়া ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি গুলশানের বাসভবন থেকে নিজে হেঁটেই গাড়িতে ওঠেন। পুরান ঢাকার আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ আদালতেও তিনি নিজে হেঁটে প্রবেশ করেন। সেদিন পাঁচ বছরের সাজা ঘোষণার পর তাঁকে গাড়িতে করে নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে নেওয়া হয়। কারাগারের মূল ফটক পার হয়ে তিনি নিজেই হেঁটে সেল পর্যন্ত যান। এরপর আর কখনো তাঁকে হাঁটতে দেখা যায়নি।
কারাগারে চিকিৎসা না পাওয়া
কারাগারে যাওয়ার পর থেকেই বিএনপি বলে আসছে, খালেদা জিয়াকে যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ শীর্ষ নেতারা ২০২০ সাল থেকেই অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকার তাঁকে পরিকল্পিতভাবে ‘স্লো পয়জনিং’-এর শিকার করেছে। কারাগার থেকে যতবার তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে, প্রতিবারই হুইলচেয়ারে করে নেওয়া হয়।
পরিত্যক্ত কারাগারে ২৫ মাস
২০০ বছরের পুরোনো নাজিমউদ্দিন রোডের কেন্দ্রীয় কারাগার ভবন ২০১৬ সালের জুলাইয়ে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। বন্দিদের কেরানীগঞ্জের নতুন কারাগারে স্থানান্তর করা হলেও খালেদা জিয়াকে ওই পরিত্যক্ত ভবনেই ২৫ মাস রাখা হয়। চিিকৎসকরা মনে করেন, স্যাঁতস্যাঁতে ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে তিনি শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন, যা পরবর্তী সময়ে তাঁর ফুসফুস মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আগের চিকিৎসা ইতিহাস
প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে খালেদা জিয়া ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হাঁটুর অস্ত্রোপচার করান। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে তিনি যুক্তরাজ্যে তিন মাস অবস্থান করে চোখ ও পায়ের চিকিৎসা নেন। সে সময় তাঁর চিকিৎসকরা জানিয়েছিলেন, তিনি মোটামুটি সুস্থ আছেন।
করোনার সময় সাময়িক মুক্তি
২০২০ সালে করোনা মহামারির সময় নির্বাহী আদেশে প্রথমবারের মতো ছয় মাসের জন্য খালেদা জিয়াকে সাময়িক মুক্তি দেয় তৎকালীন সরকার। শর্ত ছিল—বাসায় থেকে চিকিৎসা নিতে হবে এবং রাজনীতিতে অংশ নেওয়া যাবে না। একই শর্তে পরে আরও আটবার তাঁর মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়।
এই সময় বিএনপি ও তাঁর পরিবার বারবার উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার অনুমতির দাবি জানালেও আওয়ামী লীগ সরকার তা নাকচ করে দেয়।
অসুস্থতা নিয়ে বিতর্ক ও শেষ দিনগুলো
খালেদা জিয়ার অসুস্থতা নিয়েও আওয়ামী লীগ সরকার প্রশ্ন তোলে। ২০২৩ সালের আগস্টে তাঁর শারীরিক অবস্থা গুরুতর হলে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা চিকিৎসকরা তাঁর লিভারে অস্ত্রোপচার করেন। এ বিষয়ে তৎকালীন রাতের ভোটের নিবার্চন কারচুপির প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্র ও হাজারো ছাত্র-জনতা হত্যাকারী শেখ হাসিনা একাধিক মন্তব্য করেন, যা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ৮০ বছর বয়সী একজন মানুষের এমনিতেই মৃত্যু হতে পারে বলে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা মন্তব্য করেছিলেন।
চিকিৎসকের বক্তব্য
গতকাল মঙ্গলবার খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর তাঁর চিকিৎসক ডা. এফ এম সিদ্দিকী জানান, ফুসফুসে সংক্রমণের কারণে তিনি তীব্র শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন। রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমে যাওয়ায় ওষুধেও সাড়া মিলছিল না।
কারাগারে যাওয়ার সময় সুস্থ, মুক্তির পর অসুস্থ—এই প্রশ্নই এখন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
প্রতীক বরাদ্দের আগে নির্বাচনী প্রচারণা করা যাবে না: ইসি
হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেলেন ওবায়দুল কাদের
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সতর্কবার্তা: মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করলে আদালত অবমাননার দায় নিতে হবে