আব্দুর রহমান মিন্টু,রংপুর :
রংপুর অঞ্চলে ১০ বছরে আমনের আবাদ বেড়েছে ৬ লাখ মেট্রিক টন । এ অঞ্চলে আমন ধানের আবাদ প্রতিবছরই বাড়ছে। গত ১০ বছরে আমনের আবাদ বেড়েছে ৩৭ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে। উৎপাদন বেড়েছে ৬ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। শস্য ভাার হিসেবে পরিচিত রংপুর অঞ্চলে এ বছর আমন ধানের বাম্পার ফলন হয়েছে।ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার ও আবহাওয়া অনুকূল থাকা ও পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাতের কারণে জমিতে অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজন হয়নি, ফলে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে।
রংপুর অঞ্চলে ৫ জেলায় চলতি মৌসুমে আমন ধানের বাম্পার ফলনের আশা করা হচ্ছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে গেছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবার আমন ধানের চাল উদ্বৃত্ত থাকবে বলে আশা প্রকাশ করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। উদ্বৃত্ত চাল দেশের অন্য জেলার চাহিদা মেটাতে সহায়তা করবে। মাঠ পর্যায়ে কৃষক ও বর্গাচাষিরা জানান, রাসায়নিক সার, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ আগের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু বাজারে প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১,২০০ টাকা, যা দিয়ে খরচই ওঠে না।কৃষকদের দাবি, অন্তত ১,৫০০-১,৬০০ টাকা মণ মূল্য না হলে তারা লাভবান হতে পারবেন না। বেশ কয়েকজন কৃষক অভিযোগ করেন, খাদ্য বিভাগ কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি ধান না কিনে মিল মালিক ও বড় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাল কেনে। ফলে দাদন ব্যবসায়ীদের উচ্চসুদের ঋণ শোধ করতে কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করেন। ক্ষুদ্র ও বর্গাচাষিদের নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় তারা সরকারি ধান বিক্রয় কর্মসূচির সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হন।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১৬ সালে রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা জেলায় আমন ধানের আবাদ হয়েছিল ৫ লাখ ৮৫ হাজার ৬১৩ হেক্টর জমিতে। উৎপাদন হয়েছিল ১৪ লাখ মেট্রিক টনের বেশি।এবার আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে আবাদ হয়েছে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে। এই পরিমাণ জমি থেকে উৎপাদন হবে ২০ লাখ ১০ হাজার ৪০৫ মেট্রিক টন।২০২৩ সালে রংপুর অঞ্চলের ৫ জেলায় আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৬ লাখ ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে। সেখানে আবাদ হয়েছিল ৬ লাখ ১৬ হাজার ৬৬২ হেক্টর। প্রতি হেক্টরে গড় উৎপাদন ধরা হয় ৩ মেট্রিক টনের কিছুটা বেশি।
প্রতি বছরই আমনের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে বৃষ্টি-নির্ভর এই ধানে কাঙ্ক্ষিত বৃষ্টির দেখা পাননি এই অঞ্চলের কৃষকরা। ফলে সেচ দিয়ে আবাদ করতে হয়েছে। এতে উৎপাদন খরচ কিছুটা বেড়েছে।
রংপুর সিটি করপোরেশন এলাকার ৩৩ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা হারুন , এ রহমান ও ইসলামসহ বেশ কয়েকজন ধান চাষি বলেন, আমনের চারা রোপণ থেকে শুরু করে ধান কাটা-মাড়াইয়ের আগে পর্যন্ত জমিতে সেচ দিতে হয়েছে। আমন আবাদের মৌসুমে যে পরিমাণ বৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল, এলাকায় সেই পরিমাণ বৃষ্টি পাওয়া যায়নি। তারা জানান, এক বিঘা জমিতে প্রতি ঘণ্টায় ১২০/১৩০ টাকা করে ১৬ ঘণ্টা সেচ দিয়ে চারা রোপণ করেছেন। এতে তাদের বাড়তি খরচ পড়েছে ২ হাজার টাকার বেশি।
মিঠাপুকুর উপজেলার বর্গা চাষী আব্দুর রাজ্জাক জানান ৯শতাংশ জমিতে ধান করেছেন কিন্তু পোকায় খেয়েছে তার ধান । তিনি বলেন কয়েক বার ওষুধ দিয়েও ফলন ভাল হয়নি তার ।সদর উপজেলার আমন চাষি আমিনুর রহমান ২ একর জমিতে আমন আবাদ করেছেন। খেতে পানি না থাকার কারণে প্রতি ঘণ্টায় ১২০ টাকা করে সেচের মাধ্যমে পানি দিয়েছেন।কৃষিবিদ আবিদ করিম মুন্না বলেন, আমন ধান এই অঞ্চলের কার্তিকের মঙ্গা দূর করেছে। ফলে কার্তিক মাসেও কৃষকের মুখে হাসি থাকে। এখন পর্যন্ত আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তাদের মাঝে স্বস্তির ভাব দেখা গেছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সাইফুল আলম বলেন, ‘এ বছর রংপুরে আমন ধানের ফলন অত্যন্ত ভালো হয়েছে। উৎপাদিত প্রায় সাড়ে ৫ লাখ মেট্রিক টন চালের মধ্যে স্থানীয় চাহিদা বাদ দিয়ে অতিরিক্ত ৩ লাখ মেট্রিক টন দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।’
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, এই অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে আমন ধান চাষে আগ্রহ বাড়ায় আবাদ ভাল হয়েছে। তাই লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি ধান চাষ হয়েছে। তিনি বলেন কৃষক চলতি বছর ধানের দাম ও ভাল পাচ্ছে । ধান গাছকে পোকার আক্রমণ থেকে রক্ষা করতে ডেড পার্চিং ও লাইভ পার্চিং পদ্ধতি ব্যবহার করছেন কৃষক। ফলে উন্নত ধানের ফলন হচ্ছে। তিনি আরও বলেন রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার ৩,৬৯,১৬০ হেক্টর আমন ধানক্ষেতে কৃষকরা বাঁশের খুঁটি বা গাছের ডাল স্থাপন করায় চাষীরা পোকার ক্ষতিথেকে রক্ষা পেয়েছে ।

আরও পড়ুন
ভাঙ্গুড়ার রুহুল বিলে হাজারো সৌখিন মৎস্য শিকারীর বাউত উৎসব
ভাঙ্গুড়ায় নকল দুধের কারখানা আবিস্কার:বিপুল পরিমাণ উপকরণ জব্দ
শ্রীমঙ্গলে শ্রমিক অধিকার পরিষদের নতুন কমিটি ঘোষণা