বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার কবরে গিয়ে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন দলীয় নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা থেকে দিনভর রাজধানীর জিয়া উদ্যানে সাধারণ মানুষের ঢল দেখা গেছে। অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। তাদের প্রিয় নেত্রীর আত্মার মাগফেরাত কামনায় মোনাজাতও করেন। কাউকে কাউকে কোরআন তেলাওয়াত করতে দেখা যায়। খবর বাসস-এর।
নতুন বছরের প্রথম ও দ্বিতীয় দিনে জাতি যেন আনন্দ ভুলে ডুবে আছে শোক, স্মৃতি আর ভালোবাসার গভীর আবেশে। হাতে ফুল, মুখে দোয়া আর অশ্রুসজল চোখে মানুষ ছুটে আসছেন প্রিয় নেত্রীর কবর জিয়ারতে।
শীতের ভোর উপেক্ষা করে কেউ এসেছেন বাসে, কেউ ট্রাকে, আবার কেউ দল বেঁধে হেঁটেই— একটাই উদ্দেশ্য, খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।
নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ থাকার পর সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেওয়া হয় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে যাওয়ার লেক রোড। জিয়া উদ্যানের প্রবেশমুখ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। শান্তিপূর্ণভাবে শ্রদ্ধা নিবেদনে সহযোগিতা করেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।
কবর জিয়ারতে আসা মানুষের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত নন— এমন বহু সাধারণ মানুষও আবেগাপ্লুত হয়ে শ্রদ্ধা জানান। কারো হাতে ফুল, কারো চোখে অশ্রু, আবার কারো ঠোঁটে নীরব প্রার্থনা— সমাধিস্থল পরিণত হয় এক গভীর আবেগঘন মিলনস্থলে।
দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবর জিয়ারত করতে আসা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ বলেন, ‘খালেদা জিয়ার জানাজায় মানুষের অভূতপূর্ব উপস্থিতি প্রমাণ করে— তিনি এ দেশের মানুষের হৃদয়ে কতটা গভীরভাবে স্থান করে নিয়েছেন। আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করেছি তাঁর জানাজায় শরিক হতে পেরে। আজ যখন তাঁর মাজার জিয়ারতের সুযোগের কথা শুনেছি, তখনই ছুটে এসেছি তাঁর জন্য দোয়া করার জন্য।’
তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া ছিলেন একজন নির্ভেজাল, নিবেদিতপ্রাণ গণতান্ত্রিক নেত্রী, যিনি নিজের জন্য কিছু চাননি, বরং আজীবন দেশ, মাটি ও মানুষের কথা বলেছেন।’
মিরপুর থেকে আসা মোতালেব মিয়া জানান, গতকাল রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের জন্য কবর জিয়ারত করতে পারিনি। তাই আজকে সকালে কবর জিয়ারত করতে এসেছি।’

তিনি আরো বলেন, ‘খালেদা জিয়ার ওপর যে ধরনের নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা নজিরবিহীন। তাঁকে গৃহবন্দি করে রাখা হয়েছে, নির্বাচনে অংশ নিতে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন, মিথ্যা মামলায় কারাবন্দি করা হয়েছে এবং গুরুতর অসুস্থতা সত্ত্বেও বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি।’
চাঁদপুর থেকে আসা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমি কোনো রাজনৈতিক দলের মানুষ নই। বেগম খালেদা জিয়াকে সবসময়ই ভালোবাসতাম। তাঁর নেতৃত্বে দেশের যে সময়টা কেটেছে, সেটাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে সোনালি সময় মনে করি। আজকে তাঁকে শ্রদ্ধা ও তাঁর জন্য দোয়া করতে পেরে ভালো লাগছে।’
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর থেকে দুই সন্তানকে নিয়ে আসেন তামান্না আক্তার। তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়া শুধু একজন রাজনীতিক নন, তিনি ছিলেন একজন সাহসী নারী নেতৃত্বের প্রতীক। তাঁর প্রতি গভীর ভালোবাসা আর সম্মান থেকেই আজ দুই সন্তানকে নিয়ে দোয়া করতে এখানে এসেছি। তিনি রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে উঠেছিলেন দেশের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তাঁর জীবন, সংগ্রাম ও নেতৃত্ব আজও বহু মানুষের অনুপ্রেরণা।’
গত দইদিন ধরে খালেদা জিয়ার কবরের পাশে মানুষের এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অবিরাম উপস্থিতি যেন নীরবে ঘোষণা করে— একজন রাষ্ট্রনায়কের শারীরিক প্রস্থান কখনোই তাঁর আদর্শ, নেতৃত্ব ও প্রভাবকে মুছে দিতে পারে না। সময়ের ব্যবধান যতই বাড়ুক, স্মৃতির গভীরে তিনি রয়ে যান চিরকাল।
উল্লেখ্য, গত মঙ্গলবার (৩০ ডিসেম্বর) ভোর ৬টায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন।
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
আ.লীগ ভুল স্বীকার না করলে জনগণ ক্ষমা করবে না: শফিকুল আলম
৭ জানুয়ারির পর সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি ইনকিলাব মঞ্চের
তথ্যে গড়মিলে বগুড়া-২ আসনে মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল