Thursday, January 15th, 2026, 3:55 pm

সখীপুরে অর্ধশতাব্দীর ইমামতি শেষে মসজিদের ইমামকে রাজকীয় বিদায়

সখীপুর(টাঙ্গাইল):

টাঙ্গাইলের সখীপুর উপজেলায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে ইমামতি করার পর অবসর গ্রহণ করায় এক ব্যতিক্রমধর্মী ও হৃদয়স্পর্শী সংবর্ধনায় বিদায় জানানো হয়েছে মসজিদের প্রবীণ ইমাম মৌলভী আবদুর রশীদকে। এলাকাবাসীর আয়োজনে এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে আবেগ, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়েছে।

সখীপুর উপজেলার বড়চওনা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চারিবাইদা বাজার জামে মসজিদের পেশ ইমাম মৌলভী আবদুর রশীদ সুদীর্ঘ ৫২ বছরের গৌরবোজ্জ্বল ইমামতি জীবন শেষে অবসর গ্রহণ উপলক্ষে মঙ্গলবার (১৩ জানুয়ারি ২০২৬) বাদ জোহর এক বিদায়ী সংবর্ধনা ও দোয়া মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। চারিবাইদা বাজার জামে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় সমাজবাসী যৌথভাবে এ আয়োজন করেন।

মৌলভী আবদুর রশীদ ছিলেন ইমাম পরিবারে জন্ম নেওয়া এক আলোকিত ব্যক্তিত্ব। তাঁর পিতা প্রয়াত ইদ্রিছ আলী মুন্সীও ছিলেন ইমামতি পেশায় নিয়োজিত। বাবার হাত ধরেই ছাত্রজীবন থেকে ইমামতি শুরু করেন তিনি। আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭৩ সাল থেকে ইমামতি পেশায় যুক্ত হয়ে আজ পর্যন্ত তিনি দ্বীনি খেদমতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে নিয়োজিত রেখেছেন।

ইমামতির পাশাপাশি তিনি ১৯৮১ সালে উপজেলার সর্ববৃহৎ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নামদারপুর ফাজিল ডিগ্রি মাদরাসায় শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন এবং দীর্ঘ ৩৯ বছর শিক্ষকতা শেষে ২০২০ সালে অবসর গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা জীবন শেষ হলেও ইমামতি থেকে অবসর নেননি; বরং আরও ছয় বছর অতিবাহিত করে মোট ৫২ বছরের ইমামতি জীবন পূর্ণ করেন। তাঁর ছাত্রদের অনেকেই আজ সমাজ ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন, এমনকি কেউ কেউ হয়েছেন তাঁর সহকর্মী।

দীর্ঘ এই সময়জুড়ে তিনি সততা, আল্লাহভীতি ও নিষ্ঠার সঙ্গে ইমামতি ও দ্বীনি দায়িত্ব পালন করে এলাকাবাসীর কাছে একজন আলোকবর্তিকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। বর্তমানে বয়সের ভারে নুয়ে পড়ায় ৮১ বছর বয়সে মসজিদে নিয়মিত যাতায়াত তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। যদিও মসজিদ কমিটি ও মুসল্লিদের ইচ্ছা ছিল জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ইমামতি চালিয়ে যাবেন, বাস্তবতার কারণে তা সম্ভব না হওয়ায় সম্মানজনক বিদায়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

মসজিদের ইমামকে গণসংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায় জানানোয় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক প্রশংসা কুড়িয়েছে।

মৌলভী আবদুর রশীদ ২০০৬ সালে উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা ইমাম সংঘের উদ্যোগে উপজেলার শ্রেষ্ঠ ইমাম হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে তাঁকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করে নেওয়া হয়, সম্মাননা উপহার প্রদান করা হয় এবং প্রায় অর্ধশত মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে শোভাযাত্রার মাধ্যমে কয়েকটি গ্রাম প্রদক্ষিণ করে রাজকীয় পরিবেশে তাঁকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হয়।

দোয়া মাহফিলে কয়েকটি গ্রামের বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নেন।

বক্তারা মৌলভী আবদুর রশীদের দীর্ঘ কর্মময় জীবনের অবদান স্মরণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন; অনেকেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি।

স্থানীয়দের মতে, একজন ইমামকে এভাবে সম্মান জানানো সমাজে ইতিবাচক বার্তা বহন করে এবং ইমামদের মর্যাদা ও গুরুত্ব নতুন করে তুলে ধরে। এমন সংবর্ধনা সমাজে বিরল ও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত।