বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং ক্রমবর্ধমান যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়ন’ ইস্যুটিকে আগামী ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ইশতেহারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার দাবি জানিয়েছে দেশের নাগরিক সমাজ ও পরিবেশবাদী বিভিন্ন সংগঠন। তাদের মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশই তরুণ, আর এই বিপুল জনশক্তিকে যদি সঠিক কর্মসংস্থান বা উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা না যায়, তবে দেশ এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়বে।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে রাজধানীর পুরানা পল্টনস্থ গ্রিন বিজনেস লাউঞ্জে আয়োজিত এক মুক্ত সংলাপে বক্তারা এসব কথা বলেন। গ্রিনটেক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, গ্রিন কমিউনিটি এন্ট্রাপ্রেনিওর ক্লাব এবং ইন্টার প্রেস নেটওয়ার্কের যৌথ উদ্যোগে এই সংলাপটি অনুষ্ঠিত হয়। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে অনুষ্ঠিতব্য ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য এই প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
জনমিতিক লভ্যাংশ কি অভিশাপ হবে?
সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গ্রিনটেক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের নির্বাহী পরিচালক লুৎফর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে দেশের ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড বা জনমিতিক লভ্যাংশের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই যুবক। একটি জাতির জন্য এটি একটি বড় আশীবাদ। কিন্তু এই বিপুল শক্তিকে যদি আমরা উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে না পারি, যদি প্রতিটি রাজনৈতিক দল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এই যুবকদের জন্য স্পষ্ট ও সময়াবদ্ধ (Time-bound) কর্মপরিকল্পনা না রাখে, তবে এই সম্ভাবনাটিই ভবিষ্যতে বড় সংকটের কারণ হয়ে দাঁড়াবে।”
লুৎফর রহমান আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রশংসনীয় হলেও যুব বেকারত্বের হার দুশ্চিন্তার কারণ। বিশেষ করে শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব এবং ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা যোগ্যতার সঙ্গে কাজের অসামঞ্জস্যতা দিন দিন বাড়ছে। এই সংকট কাটাতে তিনি রাজনৈতিক দলগুলোকে গৎবাঁধা প্রতিশ্রুতির বাইরে এসে বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনার দাবি জানান।
চ্যালেঞ্জ: স্কিল মিসম্যাচ ও কারিগরি শিক্ষার অভাব
সংলাপে বক্তারা বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তারা বলেন, প্রতি বছর লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল পাওয়া যাচ্ছে না। এই ‘স্কিল মিসম্যাচ’ দূর করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা (TVET) ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি কারিগরি দক্ষতাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের চাহিদাকে মাথায় রেখে শিক্ষা কারিকুলাম সাজাতে হবে।
নারী উদ্যোক্তা ও অর্থায়নের সংকট
বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় নারীদের অংশগ্রহণ অপরিহার্য হলেও উদ্যোক্তা হিসেবে তারা এখনো অনেক পিছিয়ে। সংলাপে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ নীতিমালার ওপর জোর দেওয়া হয়। লুৎফর রহমান বলেন, “নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। অনেক সময় ব্যাংক থেকে অর্থায়ন পেতে নারী উদ্যোক্তারা নানা আমলাতান্ত্রিক জটিলতার শিকার হন। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সমাধান থাকতে হবে।”
ভবিষ্যতের সমাধান: গ্রিন জব ও ইনোভেশন
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে সংলাপে ‘গ্রিন জব’ বা পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা বলেন, পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি আয় নিশ্চিত করে এমন কর্মসংস্থানই হবে আগামী দিনের মূল চালিকাশক্তি। এছাড়া তরুণদের উদ্ভাবনী শক্তি বা ‘ইনোভেশন’-কে উৎসাহিত করতে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার দাবি জানানো হয়।
বক্তারা দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, অনেক সময় তরুণরা চমৎকার সব উদ্ভাবনী আইডিয়া নিয়ে এলেও সঠিক পরিচর্যা এবং অর্থের অভাবে সেগুলো অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যায়। আমাদের দেশের তরুণরা জন্মগতভাবেই বড় ইনোভেটর, তাদের সঠিক ‘পেট্রোনাইজ’ বা পৃষ্ঠপোষকতা করা গেলে বাংলাদেশ বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে।
রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান
সংলাপের সভাপতি ও গ্রিন কমিউনিটি এন্ট্রাপ্রেনিওর ক্লাবের নেতৃবৃন্দ বলেন, নির্বাচনের সময় দলগুলো অনেক বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিলেও নির্বাচনের পর অনেক ক্ষেত্রে তার বাস্তবায়ন দেখা যায় না। তাই এবার শুধু প্রতিশ্রুতি নয়, প্রতিটি ইশতেহারে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা থাকতে হবে। রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ মানুষের কাছে দায়বদ্ধ হতে হবে যে, তারা ক্ষমতায় গেলে কীভাবে এবং কত সময়ের মধ্যে এই কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব ও উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন কমিউনিটি এন্ট্রাপ্রেনিওর ক্লাব লিমিটেডের প্রেসিডেন্ট আলতাফ হোসাইন। তিনি বলেন, “কর্মসংস্থান সৃষ্টি ছাড়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি টেকসই হয় না। উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি শক্তিশালী করা এবং যুবসমাজকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাই হওয়া উচিত আগামী দিনের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শন।”
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব, বিসিএস প্রশাসন একাডেমির সাবেক রেক্টর এবং সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (স্রেডা)-এর সাবেক চেয়ারম্যান বলেন, “বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রায় এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টি। জলবায়ু পরিবর্তন, জ্বালানি রূপান্তর এবং গ্রিন ইকোনমির সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে না পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।” তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানান, যেন তারা তাদের ইশতেহারে গ্রিন কর্মসংস্থান, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং টেকসই শিল্পায়নের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ উপস্থাপন করে।
মুক্ত সংলাপে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির নির্বাহী সদস্য প্রফেসর ড. জহিরুল ইসলাম শিকদার বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক কাঠামোতে কর্মসংস্থান-বান্ধব প্রবৃদ্ধির ঘাটতি রয়েছে এবং এটি নীতি সংস্কার ছাড়া সম্ভব নয়।
ফ্যাশন ডিজাইন কাউন্সিল অব বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট মিসেস আমাতুন নূর শিল্পি নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ অর্থায়ন, বাজার সংযোগ এবং নীতিগত সহায়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সদস্য প্রফেসর সজল চন্দ্র দাশ বলেন, শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যে বিদ্যমান ব্যবধান কমাতে না পারলে বেকারত্ব আরও বাড়বে।
গ্রিনটেক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের উপদেষ্টা প্রফেসর ডা. মো. রুহুল আমিন টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) অর্জনে কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের ভূমিকা তুলে ধরেন। নাগরিক ঐক্যের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এফবিসিসিআই সদস্য জনাব লায়ন দেলোয়ার হোসেন রাজা বলেন, প্রাইভেট সেক্টরকে সম্পৃক্ত না করে বৃহৎ কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। ইন্ডাস্ট্রিয়ালিস্ট অ্যান্ড বিজনেস ওয়েলফেয়ার ফেডারেশনের সদস্য জনাব জাকারিয়া হোসাইন শিল্পখাতে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির আহ্বান জানান। হোপ ৮৭-এর কান্ট্রি ডিরেক্টর জনাব রেজাউল করিম বাবু উন্নয়ন অংশীদারদের সাথে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এছাড়া যুব উদ্যোক্তা রফিকুল ইসলাম তালুকদার, নারী উদ্যোক্তা রোমানা ইয়াসমিন এবং ছাত্র প্রতিনিধি শাহাদত হোসাইন বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে কর্মসংস্থান সংকট ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরেন। বক্তারা সর্বসম্মতভাবে মত দেন, আগামী দিনে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেবেন, তাদের অবশ্যই উদ্যোক্তা সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে এবং তা সকল রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহার ও প্রচার কার্যক্রমে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
বক্তারা পরিশেষে বলেন, নির্বাচন মানে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, নির্বাচন মানে দেশ গড়ার অঙ্গীকার। যদি রাজনৈতিক দলগুলো দেশের যুবসমাজকে গুরুত্ব না দেয়, তবে সুশাসন এবং টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই আগামী ১৩তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে যে দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তাদের মূল লক্ষ্য হতে হবে দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা। সুশাসন এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য এর কোনো বিকল্প নেই।
এই সংলাপে বিভিন্ন স্তরের সাংবাদিক, অর্থনীতিবিদ, পরিবেশবাদী এবং যুব প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন, যারা সমস্বরে এই দাবিগুলোকে আগামী দিনের জাতীয় দাবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার আহ্বান জানান।

আরও পড়ুন
দুটি ব্যালট ও বেশি প্রার্থীর হওয়ায় ভোট গণনায় সময় লাগতে পারে: ইসি সচিব আখতার
সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে সেনাবাহিনী
আজ ঢাকার বাতাস ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’, দূষিত শহরের শীর্ষে লাহোর