Wednesday, February 4th, 2026, 1:11 pm

ভারতের সঙ্গে ম্যাচ বয়কটের ঘোষণা পাকিস্তানের, আইসিসির ক্ষতি ৬ হাজার কোটি টাকা

 

একজন ক্রিকেটারকে দল থেকে বাদ দেওয়ার মতো একটি সিদ্ধান্ত যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে—সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই সত্যকেই সামনে নিয়ে এসেছে। জাতীয় দলের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে ঘিরে আইপিএলের একটি সিদ্ধান্ত এখন শুধু ক্রীড়াঙ্গনেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা কূটনীতি ও বাণিজ্যিক স্বার্থের আলোচনাতেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

আইপিএলের নিলামে কলকাতা নাইট রাইডার্স মোস্তাফিজকে ৯ কোটি ২০ লাখ রুপিতে দলে নিলেও পরবর্তী সময়ে তাকে ছেড়ে দেয়। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রাজনৈতিক চাপ কাজ করেছে—এমন আলোচনা বিভিন্ন মহলে চলছে। ফলে মোস্তাফিজের চুক্তিমূল্যের পুরো অর্থই কার্যত ক্ষতির মুখে পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। কিন্তু ঘটনাটি কেবল একজন খেলোয়াড়ের আর্থিক ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি।

এই ইস্যুকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ ও ভারতের ক্রিকেট সম্পর্কেও টানাপোড়েন শুরু হয়। এর জের ধরে বাংলাদেশ আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের ঘোষণা দেয়—যে টুর্নামেন্ট ভারত ও শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের কথা। পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হয়ে ওঠে যখন পাকিস্তানও প্রথমে বিশ্বকাপ বর্জনের হুমকি দেয়। যদিও পরে তারা জানায়, পুরো টুর্নামেন্ট নয়, কেবল ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেই অংশ নেবে না।

মোস্তাফিজের ব্যক্তিগত আর্থিক ক্ষতি যেখানে প্রায় ৯ কোটির কিছু বেশি, সেখানে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বাণিজ্যিক কাঠামোয় আরও অনেক বড় আকারে প্রতিফলিত হচ্ছে। আধুনিক ক্রিকেট এখন আর শুধু মাঠের খেলা নয়—এটি সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, স্পনসরশিপ, ডিজিটাল কনটেন্ট এবং বৈশ্বিক দর্শকসংখ্যা নির্ভর এক বিশাল শিল্পখাত।

বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে কিছু ম্যাচকে ‘হাই ভ্যালু ইভেন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে ভারত–পাকিস্তান ম্যাচকে বিশ্ব ক্রিকেটের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ও বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বৈরথ ধরা হয়। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সম্প্রচারস্বত্ব, বিজ্ঞাপন, টিকিট বিক্রি ও অন্যান্য বাণিজ্যিক কার্যক্রম মিলিয়ে একটি ভারত–পাকিস্তান ম্যাচের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে—বাংলাদেশি মুদ্রায় যা ৬ হাজার কোটিরও বেশি।

ভারতীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ চলাকালে মাত্র ১০ সেকেন্ডের একটি বিজ্ঞাপন স্লট বিক্রি হয় ২৫ থেকে ৪০ লাখ ভারতীয় রুপিতে। ধারণা করা হয়, একটি ম্যাচ থেকেই বিজ্ঞাপন বাবদ আয় হতে পারে প্রায় ৩০০ কোটি রুপি।

এ ধরনের বড় ম্যাচ বাতিল হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে সম্প্রচারস্বত্ব কেনা প্রতিষ্ঠানগুলো। তারা বিপুল অর্থ ব্যয় করে আইসিসির কাছ থেকে টুর্নামেন্টের স্বত্ব সংগ্রহ করে, যার বড় অংশই উঠে আসে উচ্চ দর্শকসংখ্যার ম্যাচ থেকে। ফলে নির্ধারিত ম্যাচ বর্জন বা বাতিল হলে রাজস্ব কাঠামোয় বড় ধরনের চাপ তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।

বিশ্বকাপের সম্প্রচারস্বত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর একটি জিওস্টার ইতিমধ্যেই আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কার কথা জানিয়েছে বলে জানা গেছে। বড় ম্যাচ না হলে আইসিসির ওপর ক্ষতিপূরণ বা চুক্তিভিত্তিক চাপ বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে।

সাধারণত বিশ্বকাপের প্রতিটি ম্যাচের একটি গড় বাণিজ্যিক মূল্য নির্ধারিত থাকলেও সব ম্যাচের গুরুত্ব সমান নয়। কিছু ম্যাচের আর্থিক মূল্য অন্যগুলোর তুলনায় বহুগুণ বেশি—যার সবচেয়ে বড় উদাহরণ ভারত–পাকিস্তান দ্বৈরথ। এই ম্যাচ না হলে শুধু তাৎক্ষণিক আয়ই কমবে না, স্পনসরদের ব্র্যান্ড প্রচারণা ও চুক্তিভিত্তিক লক্ষ্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে আইসিসি, সংশ্লিষ্ট ক্রিকেট বোর্ড ও সম্প্রচার অংশীদারদের মধ্যে জটিল আর্থিক সমীকরণ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ বিশ্বকাপে অংশ না নিলে তারাও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বে। অংশগ্রহণ ফি, সম্প্রচার আয়ের ভাগ, স্পনসরশিপ ও বৈশ্বিক প্রচারণা—সব মিলিয়ে একটি বড় টুর্নামেন্ট মিস করা মানে কয়েক কোটি ডলারের সম্ভাব্য আয় হারানো।

সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে দিচ্ছে—আধুনিক ক্রিকেট কেবল ব্যাট-বলের লড়াই নয়। এটি এখন কূটনৈতিক সম্পর্ক, করপোরেট বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক দর্শকবাজারের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত এক জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। একজন খেলোয়াড়কে ঘিরে নেওয়া সিদ্ধান্তও তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের আর্থিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।

এনএনবাংলা/পিএইচ