বাংলাদেশে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। একই দিনে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থার কাঠামো নির্ধারণে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। ২০২৪ সালের গণ–অভ্যুত্থানের পর এটি বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন, ফলে এই নির্বাচনকে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রার এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৬ বছরের কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান ঘটে। শেখ হাসিনার সরকারের দমন–পীড়নের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক বিশ্বাস ও পেশার মানুষ এক হয়ে প্রতিবাদে নেমেছিলেন। সেই ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মধ্য দিয়েই হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে সত্যিকারের গণতান্ত্রিক নির্বাচনের ব্যাপারে নতুন আশার সঞ্চার হয়।
এবারের নির্বাচনে তরুণ প্রজন্ম—বিশেষ করে জেনারেশন জেড ও মিলেনিয়াল ভোটাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। অনেকের মতে, এই তরুণ ভোটাররাই ঠিক করবেন পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবেন। তরুণদের একটি বড় অংশ বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন, বিশেষ করে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত কার্যক্রমগুলোতে তাঁদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
সম্প্রতি ওয়াশিংটনভিত্তিক গণমাধ্যম দ্য ডিপ্লোম্যাট–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান নানা বিষয়ে নিজের পরিকল্পনা ও ভাবনার কথা তুলে ধরেন। সাক্ষাৎকারের সময় তিনি যমুনা নদীর তীরে একটি রাজনৈতিক সভায় অংশ নিচ্ছিলেন।
২০ বছরের ব্যবধানে রাজনীতির পরিবর্তন
২০০৬ সালের পর এবারই প্রথম সরাসরি জেলা পর্যায়ের কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন তারেক রহমান। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগের কর্মসূচিগুলো মূলত দলের নেতা–কর্মীদের কেন্দ্র করেই হতো। কিন্তু এখন সব বয়স ও শ্রেণি–পেশার মানুষ তাঁর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন। মানুষের মধ্যে পরিবর্তনের জন্য প্রবল আকাঙ্ক্ষা লক্ষ্য করছেন বলে জানান তিনি। বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলা, মতবিনিময় করা এবং তাঁদের উদ্দীপনা তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতা দিচ্ছে।
জেন-জি ভোটারদের সমর্থন
তারেক রহমানের মতে, জেন-জি প্রজন্মের চিন্তাভাবনার সঙ্গে বিএনপির কর্মসূচির মিল রয়েছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি শিক্ষা, আইটি খাতের উন্নয়ন এবং ক্রীড়াক্ষেত্রের বিকাশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে তরুণরা বিএনপির প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। তিনি জানান, ‘দ্য প্ল্যান’ নামের এক কর্মসূচির মাধ্যমে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মতামত শোনা হচ্ছে, যা তাঁকে জেন-জির সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত করেছে।
নিজের জনপ্রিয়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটিকে তিনি চাপ নয়—বরং দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন কি না—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, জনগণই শেষ পর্যন্ত ঠিক করবে কোন দলের পরিকল্পনা তাদের জন্য উপযুক্ত।
অর্থনীতি নিয়ে স্বপ্ন ও পরিকল্পনা
বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার প্রতিশ্রুতি প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, এটি কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। বর্তমানে দেশের অর্থনীতি মূলত গার্মেন্টস ও রেমিট্যান্সনির্ভর। ভবিষ্যতে আইটি খাত, সেমিকন্ডাক্টর শিল্প, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং, এসএমই, ফুটওয়্যার ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। মাছ ও সবজি উৎপাদন বাড়িয়ে রপ্তানির সুযোগ তৈরির কথাও তিনি উল্লেখ করেন।
ব্যাংকখাতে খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, এসব অনিয়ম ঘটেছে আগের স্বৈরাচারী শাসনামলে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় এলে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে এবং শক্তিশালী আর্থিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দুর্নীতি দমন করা সম্ভব হবে।
আইনশৃঙ্খলা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হলে তারেক রহমান বলেন, একটি নির্বাচিত সরকার জনগণের প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব করে। তিনি এমন একটি পরিবেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন যেখানে মানুষ নিরাপদে চলাচল করতে পারবে, বাক্স্বাধীনতা থাকবে এবং মানবাধিকার নিশ্চিত হবে।
দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণের শিকার হয়েছে স্বীকার করলেও তিনি মনে করেন, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব প্রতিষ্ঠান আবার শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
পররাষ্ট্রনীতি ও জলবায়ু পরিকল্পনা
পররাষ্ট্রনীতির বিষয়ে তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেন, তাঁর নীতি হবে “বাংলাদেশ ফার্স্ট।” জাতীয় স্বার্থকে সবার ওপরে রেখে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ সব দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও লাভের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা হবে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় তিনি ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন ও ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনার কথা জানান। দুর্নীতি বন্ধ করে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে জলবায়ু খাতে কার্যকর বিনিয়োগ সম্ভব বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জনগণের প্রতি প্রতিশ্রুতি
ভবিষ্যৎ সরকারের প্রধান অঙ্গীকার সম্পর্কে জানতে চাইলে তারেক রহমান বলেন, বিএনপির ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নই হবে মূল লক্ষ্য। পরিবার কার্ড, কৃষক কার্ড, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থান—এই সাতটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করাই তাঁর রাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। জনগণের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই তাঁর প্রধান প্রতিশ্রুতি।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
বাংলাদেশের বন্ধু থাকবে, কিন্তু কোথাও কাউকে প্রভু মানব না: জামায়াত আমির
শ্রমিকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে চট্টগ্রাম বন্দরে অচলাবস্থা
গুপ্তরা এখন নতুন জালেমের ভূমিকায় আবির্ভাব হয়েছে: তারেক রহমান