জুলাই অভ্যুত্থানের মাধ্যমে উঠে আসা রাষ্ট্র সংস্কারের গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে নির্বাচন কমিশন (ইসি) ও সরকারের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, আইনি জটিলতা এবং রাজনৈতিক চাপ বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলেন, ঐতিহাসিক গুরুত্বসম্পন্ন গণভোট আয়োজনের ক্ষেত্রে অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্ত, অস্পষ্ট আইনগত ব্যাখ্যা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অভাব জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করছে। এর ফলে পুরো প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘গণভোট ও প্রাক-নির্বাচন পরিস্থিতি : টিআইবির পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক প্রতিবেদন উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে দৃশ্যমান দুর্বলতা দেখাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলোর চাপের মুখে অনেক ক্ষেত্রে কমিশন দৃঢ় অবস্থান নিতে পারছে না। অনলাইন ও অফলাইন—দুই ক্ষেত্রেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটলেও ইসি কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থ হচ্ছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি অংশ নিরপেক্ষ পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রত্যাশিত ভূমিকা রাখছে না। মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রাহকদের হয়রানি ও হুমকির ঘটনাও উদ্বেগজনক।
অনলাইন অপপ্রচার নিয়ে উদ্বেগ
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে অপপ্রচার, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও ব্যক্তিগত আক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুগল ও মেটার মতো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘনকারী কনটেন্ট সরাতে যথাযথ ভূমিকা রাখছে না বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থ বড় ভূমিকা পালন করছে। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পর্যাপ্ত যোগাযোগ ও সমন্বয়ের অভাবে ভবিষ্যৎ নির্বাচনী ব্যবস্থার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা গ্রহণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গণভোট নিয়ে আইনি জটিলতা ও সরকারের দোদুল্যমানতা
গণভোট ইস্যুতে সরকারের ভূমিকা নিয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থানের কারণে সরকার শুরু থেকেই দোটানায় ছিল। উভয় পক্ষকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় জারি করা অধ্যাদেশ গণভোটের প্রশ্ন ও উদ্দেশ্যকে আরও অস্পষ্ট করে তুলেছে।
একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের সিদ্ধান্তকে অপ্রয়োজনীয় জটিলতা বলে অভিহিত করেন তিনি। তার মতে, নির্বাচন কমিশন গণভোটকে ‘নির্বাচন’-এর সমার্থক হিসেবে বিবেচনা করছে, যা আইনি বিচ্যুতি। কারণ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী গণভোট কোনোভাবেই নির্বাচনের সমতুল্য নয়
সরকারি কর্মচারী ব্যবহারে বিতর্ক
তফসিল ঘোষণার পর সরকারি কর্মচারীরা নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকার কথা থাকলেও সরকার তাদের গণভোটের পক্ষে প্রচারণায় ব্যবহারের নির্দেশনা দিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে বলে জানান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ইসির অনুমোদন নেওয়া উচিত ছিল।
এছাড়া ব্যাংক ও এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া, গণভোট পরিচালনার অর্থায়ন ও ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্র সংস্কারে টিআইবির প্রস্তাব
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণভোটের ভিত্তি হওয়া উচিত জুলাই অভ্যুত্থান থেকে উৎসারিত ‘জুলাই সনদ’। এই ঐতিহাসিক সুযোগ কাজে লাগিয়ে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন জরুরি।
টিআইবির পক্ষ থেকে তিনি কয়েকটি সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন—
সংবিধানের ২০(২) অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ক্ষমতার অপব্যবহারকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, দুর্নীতি দমন কমিশনকে সাংবিধানিক মর্যাদা দেওয়া, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ আসনে উন্নীত করা এবং অন্তত ৩৩ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়ন নিশ্চিত করা।
এছাড়া সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে অর্থবিল ও অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে সংসদ সদস্যদের নিজ দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়ার সুযোগ, ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতির পদে বিরোধী দলের সদস্যদের নিয়োগের দাবিও জানান তিনি।
সবশেষে তিনি বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের মূল চেতনা অনুযায়ী জবাবদিহিমূলক গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিচার বিভাগসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি। তিনি দেশবাসীকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘না’ এবং জুলাই সনদের আলোকে রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে স্পষ্টভাবে ‘হ্যাঁ’ বলার আহ্বান জানান।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
ভোট উপলক্ষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমিত রাখার নির্দেশ
নির্বাচনে রিকুইজিশন করা গাড়ির দৈনিক খোরাকি ৪,৯০০ টাকা
হাদি হত্যার সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইল সরকার