র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্সের (ডিজিএফআই) বিরুদ্ধে গুম-খুনসহ গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে সংস্থা দুটিকে বিলুপ্ত করার দাবি জানিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) ইকবাল করিম ভূঁইয়া।
আজ সোমবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত এক মামলায় সাক্ষ্য দিতে গিয়ে তিনি এ দাবি জানান। বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনালে তাঁর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়।
সাক্ষ্যে ইকবাল করিম ভূঁইয়া বলেন, “আমি মনে করি, র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা দরকার। সেটি সম্ভব না হলে অন্তত র্যাবে কর্মরত সেনাসদস্যদের সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা উচিত।”
তিনি আরও বলেন, “ডিজিএফআইকেও বিলুপ্ত করা উচিত। কারণ এই সংস্থাটি হত্যার মতো অপসংস্কৃতির জন্ম দেওয়ার পর আর টিকে থাকার নৈতিক বৈধতা হারিয়েছে।”
উল্লেখ্য, ইকবাল করিম ভূঁইয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ২০১২ সালের ২৫ জুন থেকে ২০১৫ সালের ২৫ জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
গত রোববার তাঁর জবানবন্দির মাধ্যমে এ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। আজ সোমবার সাক্ষ্যগ্রহণ শেষ হওয়ার পর আংশিক জেরা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী জেরার জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
২০১৩ সালে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হতাহতের ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমি বিভিন্ন সূত্রে শুনেছি, ওই সময় র্যাব যাদের হত্যা করত, তাদের পেট চিরে নাড়িভুঁড়ি বের করে ইট-পাথর বেঁধে নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হতো।”
তিনি আরও জানান, র্যাবের এসব কর্মকাণ্ড দেখে তিনি সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ডিভিশন ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন শুরু করেন এবং কর্মকর্তাদের এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা করেন। একপর্যায়ে সেনাবাহিনীর সব কর্মকর্তাকে ঢাকায় এনে তাঁদের দায়িত্ব ও নৈতিক কর্তব্য সম্পর্কে সচেতন করেন।
তিনি বলেন, “আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিই যে, শেখ মুজিব ও জিয়া হত্যাকাণ্ডে জড়িত অনেক সামরিক কর্মকর্তা ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন। দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায়ও কয়েকজন কর্মকর্তা ফাঁসির সাজা ভোগ করছেন।”
এরপরও ‘ক্রসফায়ার’ বন্ধ না হওয়ায় তিনি ডিজিএফআই, বিজিবি ও র্যাবে সেনা কর্মকর্তা পাঠানো বন্ধ করে দেন বলে জানান। তিনি বলেন, “অনেকে আমাকে সতর্ক করেছিলেন, আমার এই সিদ্ধান্ত বিদ্রোহের শামিল হতে পারে। কিন্তু আমি মনে করেছি, হাশরের ময়দানে আল্লাহর কাছে আমাকে জবাবদিহি করতে হবে।”
এই সিদ্ধান্তের পর নানা মহল থেকে প্রবল চাপের মুখে পড়তে হয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এমনকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁকে ডেকে র্যাবে অফিসার দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু অফিসার স্বল্পতার কারণ দেখিয়ে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং অবসর নেওয়া পর্যন্ত নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকেন।
সাবেক এই সেনাপ্রধান বলেন, “র্যাবের কর্মকাণ্ডের কারণে আমার দায়িত্বকাল ছিল অত্যন্ত কষ্টদায়ক। কিছু করতে না পারার বেদনা আমাকে সব সময় তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। আজ সুযোগ এসেছে সেই অসম্পূর্ণ কাজ শেষ করার।”
তিনি আরও বলেন, “অনেকে ভাবছেন আমি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি। আসলে আত্মশুদ্ধির যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, তা কোনোভাবেই হাতছাড়া করা উচিত নয়। এতে সেনাবাহিনীর গৌরব ক্ষুণ্ন হবে না—বরং আরও বৃদ্ধি পাবে।”
সবশেষে তিনি আবারও দাবি জানিয়ে বলেন, “র্যাব অবিলম্বে বিলুপ্ত করা প্রয়োজন। তা সম্ভব না হলে অন্তত সেনাসদস্যদের বাহিনীতে ফিরিয়ে আনা হোক। একই সঙ্গে ডিজিএফআইও বিলুপ্ত করা উচিত, কারণ আয়নাঘরের মতো অপসংস্কৃতি জন্ম দেওয়ার পর এই সংস্থার আর টিকে থাকার কোনো বৈধতা নেই।”
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
আইসিসি–পিসিবি বৈঠকে বিসিবি, যা বলছে পাকিস্তানের গণমাধ্যম
নির্বাচনে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ঠেকাতে প্রস্তুত সেনাবাহিনী: ঢাকায় ২১ অস্ত্র উদ্ধার, গ্রেপ্তার ৩
থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূলে চট্টগ্রামগামী জাহাজডুবি, ১৬ বাংলাদেশি নাবিক উদ্ধার