February 10, 2026
Tuesday, February 10th, 2026, 8:47 pm

বাংলাদেশে নির্বাচনের আগে সামাজিক মাধ্যমে ‘অপতথ্যের বন্যা’, ৯০ শতাংশের উৎস ভারত

 

বাংলাদেশে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সামাজিক মাধ্যমে অপতথ্যের বন্যা দেখো দিয়েছে, যা ভোটারদের সিদ্ধান্তকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করার সম্ভাবনা রয়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, অপপ্রচারের বড় অংশই আসছে ভারত থেকে।

বাংলাদেশে ২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর এই প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ভারতে পালিয়ে যান। সেখানে হিন্দু-জাতীয়তাবাদী সরকার তাকে আশ্রয় দিয়ে রেখেছে।

এদিকে, প্রযুক্তিগত কারসাজির মাত্রা এতটাই বেড়ে গেছে যে, মিথ্যা তথ্য শনাক্ত ও মোকাবিলা করার জন্য নির্বাচন কমিশন বিশেষ একটি ইউনিট গঠন করতে বাধ্য হয়েছে। বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি অত্যাধুনিক ছবি ও ভিডিও। এসব সাধারণ মানুষের পক্ষে শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত জানুয়ারিতে জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্কের কাছে সাহায্য চেয়ে বলেছিলেন, নির্বাচন ঘিরে বিদেশি ও স্থানীয় উভয় মাধ্যম থেকে ‘অপতথ্যের বন্যা’ বয়ে যাচ্ছে।

হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিয়ে বিভ্রান্তিকর দাবিসমূহ

সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘হিন্দু গণহত্যা’ হ্যাশট্যাগে ছড়ানো পোস্ট ও ভিডিও প্রায় ৯০% ভারত থেকে এসেছে। তবে পুলিশের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে সংখ্যালঘুদের সঙ্গে সম্পর্কিত মোট ৬৪৫টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১২% সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

ভয়ংকর এআই ভিডিও

এআই-জেনারেটেড ভিডিওতে দেখা যায়, নারী ভোটারদের নির্দিষ্ট দলকে ভোট না দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছেন, অথচ এই নারীর বাস্তব অস্তিত্ব নেই। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে ছড়িয়ে থাকা এআই ভিডিওর বড় অংশেই সতর্কতা লেবেল নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট জানায়, তারা ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত শুধু এক্স প্ল্যাটফর্মে ‘হিন্দু গণহত্যা’ দাবিতে এক লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি অ্যাকাউন্ট থেকে সাত লাখের বেশি পোস্ট ট্র্যাক করেছে।

সংস্থাটির প্রধান রাকিব নায়েক এএফপিকে জানান, এসব পোস্টের ৯০ শতাংশেরও বেশি করা হয়েছে ভারত থেকে। বাকি অংশ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ক্যানাডায় সক্রিয় হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেটওয়ার্ক থেকে করা হয়েছে।

এএফপির ফ্যাক্ট চেক টিম যেসব ভুয়া খবর খণ্ডন করেছে, তার মধ্যে কিছু উদাহরণ বিস্ময়কর। ইউটিউব, ফেসবুক, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামে যে শত শত এআই-তৈরি ভিডিও ছড়িয়ে আছে, তার খুব কমই এআই সতর্কতা লেবেল দিয়ে চিহ্নিত।

ঢাকাভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ডিজিটালি রাইটের প্রধান মিরাজ আহমেদ চৌধুরী বলছেন, ‘আমরা আগের যে-কোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ভুয়া তথ্য দেখছি।’ বিনামূল্যে পাওয়া এআই টুলগুলো এখন এমন অত্যাধুনিক নকল তৈরি করতে পারে যা শনাক্ত করা অত্যন্ত কঠিন বলে জানান তিনি।

এই অপপ্রচারের প্রভাব ভার্চুয়াল জগতে সীমাবদ্ধ থাকেনি। ভারতে সোশ্যাল মিডিয়ায় হিন্দু মৌলবাদীদের তীব্র প্রতিক্রিয়ার মুখে আইপিএল লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া একমাত্র বাংলাদেশি ক্রিকেটারের চুক্তি বাতিল হয়।

বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র মো. রুহুল আমিন মল্লিক জানান, তারা মেটার সঙ্গে সমন্বয় করছে এবং সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরের জন্য বিশেষ ইউনিট গঠন করেছে। তবে প্রতিদিন হাজার হাজার নতুন পোস্টের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া একটা অন্তহীন যুদ্ধ।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন তুলি মনে করেন, বাংলাদেশের জন্য এআই-তথ্য বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। মানুষের মধ্যে তথ্য যাচাই করার সচেতনতা এখনো গড়ে ওঠেনি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী শহরে ৮০ শতাংশ এবং গ্রামে ৭০ শতাংশ পরিবারের কাছে স্মার্টফোন থাকলেও অনেকেই এই প্রযুক্তিতে নতুন।

এনএনবাংলা/