জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র একদিন বাকি। ইতোমধ্যে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা শেষ হয়েছে। মৌলভীবাজার-২ কুলাউড়া আসনের প্রার্থীরা ক্যালকুরেটারে শেষ মুহুর্তের হিসেব-নিকেষ করছেন। এবারকার নির্বাচনে আওয়ামীলীগ মাঠে না থাকায় তাদের ভোটসহ উপজেলার ২৩টি চা-বাগানের শ্রমিক ও তরুণ ভোটাররা হতে পারে জয়-পরাজয়ের ফ্যাক্টর। এই ভোটগুলো কোন প্রার্থী তাদের জয়ের জন্য টেনে নিতে পারছেন সেই উত্তাপ এখন কুলাউড়ার সর্বত্র। কে হাঁসবেন শেষ হাসি সেটি দেখার অপেক্ষায় কুলাউড়াবাসী। দেশের আলোচিত একসময়ের হেভিওয়েট রাজনৈতিক নেতাদের এ আসনে প্রতিদ্বন্ধি প্রার্থীদের লড়াইয়ের চিত্রটা এবার ভিন্ন। সকল প্রার্থীরা চা-বাগান এলাকায় অধিক গুরুত্ব দিচ্ছেন। তারা চা-শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও জীবনমান উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ভোটের ফলাফলের আগ মুহুর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে কে হবেন মৌলভীবাজার-২ আসনের আগামী দিনের এমপি।
ভোট যুদ্ধে থাকা ৮ জন প্রার্থীর মধ্যে মূলত চারজন প্রার্থীকে নিয়ে সাধারণ ভোটারদের মাঝে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কুলাউড়া উপজেলার সবকটি ইউনিয়ন, পৌরসভা ও চা-বাগানের সামষ্টিক জনমত জরিপে উঠে এসেছে চতুর্মূখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস। সমীকরণে আলোচনায় শেষ ধাপে এসে এগিয়ে রয়েছেন বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু। সোমবার বিকেলে পৌর শহরের ডাকবাংলো মাঠে স্বাধীনতা স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গণ শেষ নির্বাচনী সভা ও প্রচার মিছিলে প্রায় অর্ধলক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটে। এটি কুলাউড়ার স্মরণকালের সেরা প্রচার মিছিল বলে দাবি বিএনপি নেতাকর্মীদের। ক্লিন ইমেজের অধিকারী শওকতুল ইসলাম কুলাউড়ায় অনেক পরিচিত। দ্বিতীয় আলোচনায় রয়েছেন জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার এম সায়েদ আলী। তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোটের মাঠে বেশ আলোচনায় রয়েছেন। অন্যদিকে ভোটের মাঠে বসে নেই, স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী সাবেক তিন বারের এমপি এডভোকেট নওয়াব আলী আব্বাছ খাঁন। ভোটের মাঠে তাকে ঘিরে চলছে নানা শ্রেণীর ভোটারদের মধ্যে জটিল হিসেব-নিকেশ। তার অতীত অভিজ্ঞতা ও কাজের মুল্যায়নকে আলদা নজরে দেখছেন কুলাউড়ার গ্রামে-গঞ্জের বয়স্ক ভোটাররা। এছাড়া চমক দেখাতে পারেন কাপ-পিরিচ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মাওলানা ফজলুল হক খান সাহেদ। তাকে বিজয়ী করতে সিলেটের ফুলতলী সাহেব কিবলার অনুসারীরা দিনরাত ছুটেছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। এদিকে নিজের অদম্য চেষ্টা বুক ভরা স্বপ্ন নিয়ে জেলার একমাত্র নারী সংসদ সদস্য পদপ্রর্থী (বাসদ মার্কসবাদী মনোনীত) সাদিয়া নোশিন তাসনিম চৌধুরী কাচি প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে ব্যাপক আলোচনায় রয়েছেন বলে জনমত জরিপে উঠে এসেছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত আব্দুল কুদ্দুস হাতপাখা, জাতীয় পার্টি মনোনীত মো: আব্দুল মালিক লাঙ্গল, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান এম. জিমিউর রহমান চৌধুরী ঘোড়া প্রতীক নিয়ে ভোটের মাঠে সরব রয়েছেন।
রাঙ্গিছড়া চা-বাগানের শ্রমিক সত্য নাইডু ও কালিটি চা-বাগানের শ্রমিক দয়াল অলমিক বলেন, দেশের রাজনীতিতে বিএনপি ও আওয়ামীলীগ খুবই জনপ্রিয়। এবার আওয়ামীলীগ নির্বাচনের বাইরে থাকায় কুলাউড়ার প্রত্যেকটি চা বাগানের শ্রমিকরা রাজনৈতিক ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল হিসেবে বিএনপিকেই ধানের শীষে ভোট দিবে। কারণ বিএনপি সরকার গঠন করলে আমাদের চা-শ্রমিক জনগোষ্ঠীসহ দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন হবে বলে আমরা মনেপ্রাণে বিশ্বাসী।
বিএনপির প্রার্থী আলহাজ্ব শওকতুল ইসলাম শকু বলেন, আমি এমপি নির্বাচিত হলে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা, স্মার্ট নগর, যোগাযোগ, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, সংস্কৃতি, যুব শক্তি ও খেলাধুলা, কৃষক ও গ্রামীণ অর্থনীতি, নদী রক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ ও জলবায়ু সহনশীলতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবিক সমাজ, শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের উন্নয়ন, ধর্ম-কর্ম, গণমাধ্যম ও গণতন্ত্র, পর্যটন ও বিনিয়োগ, সন্ত্রাস, মাদক ও অপরাজনীতি বিরোধী আন্দোলনকে গুরুত্ব দিয়ে দল, মত, নির্বিশেষে সমাজের সকল বৈষম্য দূর করে একটি আধুনিক, মানবিক ও সমৃদ্ধ কুলাউড়া গড়ে তুলবো। আমার রাজনীতি উন্নয়নের, নিরাপত্তার ও মানবিক মর্যাদার, আধুনিক কুলাউড়া বিনির্মাণ করাই আমার অঙ্গীকার।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো: সায়েদ আলী বলেন, জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে পারলে কুলাউড়ার কৃতি সন্তান জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান প্রধানমন্ত্রী হবেন। আমরা মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রীর স্বাদ পাবো উন্নয়ন বঞ্চিত কুলাউড়ার দীর্ঘ ৫৪ বছরের জমে থাকা কাজের জন্য। কুলাউড়াবাসী ঐক্যবদ্ধভাবে ১১ দলের জোটের প্রার্থী দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী করবে এবং এই বিজয় আমীরে জামায়াত কুলাউড়ার কৃতী সন্তান ডাঃ শফিকুর রহমানকে উপহার দিতে চাই।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এমপি নওয়াব আলী আব্বাছ খান বলেন, কুলাউড়ার মানুষের কাছে আমি একজন পরীক্ষিত জনপ্রতিনিধি। তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে সংসদে ও এলাকায় উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছি। সেই অভিজ্ঞতা আবারও কাজে লাগাতে চাই। এটি আমার জীবনের শেষ নির্বাচন। আমি বিজয়ী হলে কুলাউড়াকে শান্তির জনপদ হিসেবে গড়ে তুলবো। উপজেলার প্রতিটি চা-বাগানের শ্রমিকসহ ক্ষুদ্র নৃ-তাত্ত্বিক জনগোষ্ঠীর লোকদের সুখে-দুঃখে সবসময় পাশে ছিলাম। আশা করছি তারা এবার আমাকে পুনরায় মূল্যায়িত করবে।
স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ফজলুল হক খান সাহেদ বলেন, কুলাউড়ার উন্নয়ন হতে হবে ইনসাফ, সুশাসন ও জবাবদিহিতার ওপর প্রতিষ্ঠিত। আমি বিশ্বাস করি, ন্যায় ও বৈষম্যমুক্ত উন্নয়ন ছাড়া মানুষের আস্থা অর্জন এবং টেকসই সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমার নির্বাচনী ইশতেহার নিছক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি নয়; এটি কুলাউড়ার প্রতিটি মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও নিরাপদ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার অঙ্গীকার। জনগণের অংশগ্রহণ ও নিয়মিত জবাবদিহিতার মাধ্যমে একটি মানবিক, ন্যায়ভিত্তিক ও সমৃদ্ধ কুলাউড়া গড়ে তোলাই আমার লক্ষ্য।
২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তরুণ ভোটারদের রাজনৈতিক সচেতনতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও সুশাসনের প্রশ্নে তারা আগের চেয়ে অনেকটা সোচ্চার বলে মনে করছেন ভোটাররা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মৌলভীবাজারের চারটি আসনের মধ্যে মৌলভীবাজার-২ আসনেই সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে আওয়ামীলীগ নির্বাচনে অংশ না নেওয়াতে তাদের কর্মী-সমর্থকদের ভোটার, চা-শ্রমিক ভোটার এবং তরুণ প্রজন্মের ভোট এবার ফলাফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
উল্লেখ্য, মৌলভীবাজার-২ কুলাউড়া আসনে ১৩টি ইউনিয়ন ও ১ পৌরসভায় মোট ভোটার সংখ্যা হলো ৩ লাখ ৩ হাজার ২০। তন্মধ্য পোস্টাল ভোট ৫ হাজার ৫৯১। ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৮৯২ জন নারী ভোটার রয়েছেন। ১ লক্ষ ৫৭ হাজার ৫২৮ জন পুরুষ ভোটার রয়েছেন। মোট ভোট কেন্দ্র ১০৩।

আরও পড়ুন
সখীপুরে উপসচিবের বিরুদ্ধে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ
কুলাউড়ায় জামায়াত প্রার্থীর নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে জয়পুরহাট র্যাব ক্যাম্পের মহড়া অনুষ্ঠিত