বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গত বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জন করেছে। এই জয়ের পর ভারতের প্রতিক্রিয়া ছিল সতর্ক কিন্তু ইতিবাচক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলায় দেওয়া এক বার্তায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিএনপির ৬০ বছর বয়সী নেতা তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানান এবং একটি গণতান্ত্রিক, প্রগতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিবেশী দেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। একই সঙ্গে তিনি দুই দেশের বহুমাত্রিক সম্পর্ক আরও জোরদার করতে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। বিবিসির বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, মোদির বার্তায় ভবিষ্যতের প্রতি দৃষ্টি থাকলেও সেখানে ছিল পরিমিত সতর্কতার সুর।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে জেনারেশন-জেড নেতৃত্বাধীন গণ-অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নিলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে টানাপোড়েন শুরু হয়। দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস বাড়তে থাকে। এবারের নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে অংশ নিতে না দেওয়ায় পরিস্থিতি আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে। অনেকের ধারণা, ক্ষমতায় থাকাকালে শেখ হাসিনার ক্রমবর্ধমান কর্তৃত্ববাদী শাসনকে দিল্লির সমর্থনই সম্পর্কে দূরত্ব বাড়িয়েছে। এর সঙ্গে সীমান্ত হত্যা, পানি বণ্টন, বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও উসকানিমূলক বক্তব্যের মতো পুরোনো অভিযোগও যুক্ত হয়েছে। বর্তমানে ভিসা পরিষেবা অনেকাংশে স্থগিত, আন্তসীমান্ত ট্রেন-বাস চলাচল বন্ধ এবং ঢাকা-দিল্লি ফ্লাইটও কমে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সংযম ও পারস্পরিক সদিচ্ছা থাকলে এই শীতলতা কাটানো সম্ভব। লন্ডনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অবিনাশ পালিওয়াল বিবিসিকে বলেন, নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকা দলগুলোর মধ্যে বিএনপিই সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও মধ্যপন্থী, যা ভারতের জন্য তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিকল্প। তবে তারেক রহমান কীভাবে দেশ পরিচালনা করবেন এবং ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কতটা স্থিতিশীল করতে পারবেন—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। কথার চেয়ে বাস্তবায়ন কঠিন হবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
দিল্লির কাছে বিএনপি অপরিচিত নয়। ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় এলে দুই দেশের সম্পর্কে দ্রুত অবনতি ঘটে। সেই সময়ে উত্তর-পূর্ব ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোর প্রশ্ন এবং বাংলাদেশে হিন্দু সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইস্যুতে দিল্লির উদ্বেগ বাড়ে। ২০০৪ সালের চট্টগ্রামে ১০ ট্রাক অস্ত্র আটক হওয়ার ঘটনাও সম্পর্কে গভীর প্রভাব ফেলে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও টাটা গ্রুপের প্রস্তাবিত বড় বিনিয়োগ গ্যাসের দাম নিয়ে জটিলতায় শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে প্রণব মুখার্জির সঙ্গে নির্ধারিত বৈঠক বাতিল করাকে দিল্লি ভালোভাবে নেয়নি। এই অস্বস্তিকর ইতিহাসই শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠতার প্রেক্ষাপট তৈরি করে।
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে নিরাপত্তা সহযোগিতা, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্যে ভারতের অনুকূলে অবস্থান—এসবই দিল্লির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবে এর রাজনৈতিক মূল্যও দিতে হয়েছে তাকে। বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত হাসিনা ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সহিংসতার ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি বলে জানা গেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ওই সহিংসতায় প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হন। তাকে প্রত্যর্পণে ভারতের অনীহা নতুন সম্পর্ক গঠনের পথে বড় বাধা হয়ে আছে।
সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় এসে খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নেন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অন্যদিকে, এক সমাবেশে তারেক রহমান ঘোষণা দেন, ‘দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়—বাংলাদেশ সবার আগে’, যা ভারতের পাশাপাশি পাকিস্তানের প্রতিও একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
হাসিনার পতনের পর ঢাকা-ইসলামাবাদ সম্পর্কেও দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ ১৪ বছর পর ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে, পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশ সফর করেছেন, সামরিক পর্যায়ে যোগাযোগ বেড়েছে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়েক বলেন, একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অধিকার রয়েছে। তবে ভারসাম্য যেন একদিকে অতিরিক্ত না হেলে পড়ে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
এদিকে নির্বাসিত শেখ হাসিনার উপস্থিতি এবং ভারতে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ওপি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক শ্রীরাধা দত্তের মতে, ভারতের মাটি ব্যবহার করে আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের চেষ্টা করলে তা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। একই সঙ্গে আন্তসীমান্ত রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর ও উসকানিমূলক মন্তব্যও সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে সব উত্তেজনার মাঝেও নিরাপত্তা সহযোগিতা এখনো সম্পর্কের মূল ভিত্তি। দুই দেশ নিয়মিত সামরিক মহড়া, সমন্বিত নৌ-টহল ও প্রতিরক্ষা সংলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। ভারতের ৫০০ মিলিয়ন ডলারের প্রতিরক্ষা ঋণসুবিধাও বহাল রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, বিএনপি এই সহযোগিতা থেকে সরে আসবে না
৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত, গভীর সাংস্কৃতিক বন্ধন ও শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক—এসব বাস্তবতা দুই দেশকে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত রেখেছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার, আর এশিয়ায় ভারতের অন্যতম বড় রপ্তানি বাজার বাংলাদেশ। তাই বিচ্ছিন্ন থাকা কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে নতুন প্রেক্ষাপটে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে পারস্পরিক আস্থা পুনর্গঠন, বাগাড়ম্বর কমানো এবং বাস্তবসম্মত সহযোগিতার ওপর। বড় প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের উদ্যোগী ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে—এমন মত দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। এখন দেখার বিষয়, দুই দেশ কত দ্রুত অতীতের অবিশ্বাস পেরিয়ে একটি নতুন সূচনার পথে এগোতে পারে।
(বিবিসির বিশেষ প্রতিবেদন)
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
নির্বাচন কমিশন সচিবালয়: ধানের শীষে ৫০% ভোট পড়েছে, ৩২% দাঁড়িপাল্লায়
ফলাফল পুনর্বিবেচনার দাবি ‘অপ্রাসঙ্গিক’, আদালতের নির্দেশ পেলে পুনর্গণনা: ইসি আনোয়ারুল
পবিত্র রমজান উপলক্ষে দেশবাসীকে প্রধান উপদেষ্টার শুভেচ্ছা