উপকূলীয় অঞ্চলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করে কৃষিকে টেকসই ও লাভজনক খাতে রূপান্তরের এক নীরব বিপ্লব ঘটছে। লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো প্রতিকূলতা সত্ত্বেও আধুনিক প্রযুক্তি, সহনশীল ফসল এবং উদ্ভাবনী চাষাবাদের মাধ্যমে কৃষকরা নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিচ্ছেন। জলবায়ু সহনশীল কৃষি এখন উপকূলীয় কৃষির প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে।
লবণাক্ততা সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি উপকূলীয় চাষাবাদে বড় পরিবর্তন এনেছে। লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত ব্যবহার করে কৃষকরা আগের তুলনায় বেশি ফলন পাচ্ছেন। পাশাপাশি ড্রিপ ইরিগেশন, সোলার পাম্প ও পলিমালচ প্রযুক্তির ব্যবহার জমির লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করছে। এসব প্রযুক্তির ফলে একসময় পতিত পড়ে থাকা জমিও এখন চাষের আওতায় আসছে, যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
বৈচিত্র্যময় ফসল চাষ কৃষিতে নতুন গতি এনেছে। আমন ধান কাটার পর রিলে পদ্ধতিতে গম চাষ করে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি লবণাক্ত জমিতে সূর্যমুখী, মুগ ডাল, তরমুজ ও বাদামের মতো লাভজনক ফসল চাষের প্রবণতা বাড়ছে। এসব ফসল শুধু কৃষকের আয় বাড়াচ্ছে না, বরং স্থানীয় বাজার ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে।
জেলার উপকূলীয় কয়রা উপজেলার উত্তর বেদকাশি গ্রামের আব্দুর রউফ জানান, আগে এসব এলাকায় লবন পানির ঘের ছিল। এখন অনেক ঘের বন্ধ করে কৃষি কাজ করা হচ্ছে। ঘের বন্ধের প্রথম বছর তেমন ফসল হয়নি। তবে আস্তে আস্তে ফলন বাড়ছে। কৃষককে শুধু বুঝতে হবে কোন ধরনের মাটিতে কোন ফসল ভালো হবে। তাহলে সে সফল হবে। আমার জমিতে কখনো বাদাম, কখনো মিষ্টি আলু, কখনো লবনসহিষ্ণু ধান চাষাবাদ করেছি। চলুন ভালো হচ্ছে।
ভাসমান ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ উপকূলীয় কৃষিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। জলমগ্ন বা লবণাক্ত জমিতে ‘পিরামিড রেইজড বেড’ ও ভাসমান (হাইড্রোপনিক্স) পদ্ধতিতে সবজি চাষ করে কৃষকরা সফল হচ্ছেন। এই পদ্ধতিতে কম জমি ও কম খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
কয়রা উপজেলার মহারাজপুর গ্রামের গৃহিণী ছন্দা লতা মল্লিক জানান, আমাদের এলাকায় বারবার নদী ভাঙ্গন, বাঁধ ভাঙ্গন হয়। ফলে এলাকা জুড়ে লবণ পানিতে ভরে যায়। তখন সব ফসল মরে যায়। সেজন্য আমরা মাচা তৈরি করে তার উপর চাষ করি৷ মাচার নিচে লবন পানি থাকে আর তার উপরে সবুজ ফসলে ভরে যায়।
কৃষির আধুনিকায়ন জীবীকার নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার ফলে শুধু কৃষকরাই নয়, কৃষি শ্রমিক, বীজ উৎপাদক, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ সংশ্লিষ্ট অনেক মানুষের কর্মসংস্থান বাড়ছে। এতে গ্রামীণ অর্থনীতি গতিশীল হচ্ছে এবং দারিদ্র্য হ্রাসে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
উপকূলীয় উপজেলা দাকোপের কৈলাশগঞ্জের যুবক মোহাম্মদ রনি। সোশ্যাল মিডিয়ায় কৃষির বিভিন্ন উৎপাদনশীল প্রতিবেদন দেখে উৎসাহিত হন কৃষিতে। বেকার এই যুবক এলাকার একজন কৃষি উদ্যোক্তা হয়ে উঠেছিন। তাকে দেখে অনেকেই কৃষিতে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেন। তিনি কখনো অন্যের জমি বর্গা নিয়ে তরমুজ কখনো রঙ্গিলা ফুলকপি চাষাবাদ করছেন।
পার্টনার প্রকল্পের সিনিয়র মনিটরিং অফিসার মোঃ মোসাদ্দেক হোসেন জানান, জলবায়ু অভিযোজনভিত্তিক কৃষি উপকূলীয় অঞ্চলে কৃষি উৎপাদন ও অর্থনীতিতে এক নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে। টেকসই প্রযুক্তি, সহনশীল ফসল এবং উদ্ভাবনী চাষাবাদের সমন্বয়ে উপকূলীয় অঞ্চল এখন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে।
স্থানীয় কৃষকরা মনে করেন, ভবিষ্যতে এ ধারাকে আরও সম্প্রসারণ করতে গবেষণা, কৃষি সহায়তা এবং প্রযুক্তি বিস্তারের ওপর জোর দেয়া প্রয়োজন।


আরও পড়ুন
২০ বছর পর জয়পুরহাটে মন্ত্রিসভায় প্রতিনিধিত্ব, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন আব্দুল বারী
নাসিরনগরে রমজানে বাজার মনিটরিং: চার ব্যবসায়ীকে জরিমানা
দেড় বিঘা জমি নিয়ে বিরোধ চাচাতো ভাই-ভাতিজাদের মারধরে প্রাণ গেল কৃষক লোকমানের