Sunday, March 8th, 2026, 5:11 pm

হাকালুকি হাওরে পাখির সংখ্যা বেড়েছে

 

জেলা প্রতিনিধি, মৌলভীবাজার:

এশিয়ার বৃহত্তম মিঠাপানির জলাভূমি নামে খ্যাত হাকালুকি হাওরে এবার জলচর পাখির সংখ্যা গত বছরের তুলনায় বেশি দেখা গেছে। অন্য বছরের মতো হাওরে বিষটোপ ও নিষিদ্ধ জালে আটকে মারা যাওয়া পাখির দেখা তেমন মেলেনি। শনিবার বিকেলে এ তথ্য জানিয়েছেন বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা, খ্যাতনামা পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। বার্ড ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৪ ও ৫ ফেব্রুয়ারি হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি চালায়। বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন এ শুমারির আয়োজন করে। এতে সহযোগিতা করেছে বন্যপ্রানী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ সিলেট। শুমারিতে অংশ নেয়া অন্য সদস্যরা হলেন, বন্যপ্রানী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় কর্মকর্তা মো: আবুল কালাম, বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু, সহ-সভাপতি জেনিফার আজমেরি, সদস্য অণু তারেক প্রমুখ। বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু বলেন, এবার হাকালুকি হাওরে ৫৩ প্রজাতির মোট ৫৪ হাজার ৪৮৬ টি জলচর পাখি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ১৮টি স্থানীয় ও ৩৫টি পরিযায়ী প্রজাতির। গত বছর শুমারিতে হাওরটিতে ৬০ প্রজাতির মোট ৩৫ হাজার ২৬৮টি পাখি পাওয়া গিয়েছিল। সেই হিসাবে এবার পাখির সংখ্যা বেড়েছে। এবার হাওরের চিনাউরা, হাওরখালসহ আরও কয়েকটি বিলের পরিবেশ তুলনামূলক ভালো ছিল, পানি বেশি ছিল। অন্য হাওরে পানি কমে যাওয়ায় এগুলোয় পাখিগুলো চলে আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত বছর শুমারিকালে হাওরের নাগুয়া-লরিবাই বিলে পাখি শিকারের জন্য প্রায় ১০০ মিটার লম্বা নিষিদ্ধ কারেন্ট জাল পাওয়া গিয়েছিল। ওই জালে আটকে মৃত দুটি টিমেঙ্কের চাপাখি মিলেছিল। পরে শুমারি দলের সদস্যরা জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করেন। পিংলা বিলের পাশে ‘কার্বোটাফ’ নামের একধরনের রাসায়নিক কীটনাশকের প্যাকেটও পাওয়া যায়। ধানের সঙ্গে ওই কীটনাশক মিশিয়ে বিলের আশপাশে ছিটিয়ে রাখা হয়। পাখিরা খাবার ভেবে তা খেয়ে মারা যেত। এবার হাওরে সেই চিত্র দেখা যায়নি বলে দাবি করেছেন বার্ড ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক সরওয়ার আলম দীপু। তিনি বলেন, আগে প্রায় প্রতিবছরই হাকালুকি হাওরে অর্ধ শতাধিক মৃত পাখি মিলত। কিন্তু এবার মেলেনি। জনসচেতনতা ও সংশ্লিষ্ট বিল ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রতিষ্ঠানের লোকজনের নজরদারির কারণে শিকারিদের অপতৎপরতা বন্ধ হতে পারে। বার্ড ক্লাব সূত্রে জানা যায়, এবার হাকালুকি হাওরে খুবই বিরল প্রজাতির সাদা কপাল রাজহাঁস ১টি দেখা মিলেছে। যেটি সারা বাংলাদেশে ১০-১২ বছরে এক বার দেখা যেত। এছাড়া হাওরে এবার প্রথম বারের মতো ১৯৪ টি রাজহাঁসের দেখা মিলেছে। যেটি বিগত সময় হাওরে পাওয়া যেতনা। হাওরে রাজহাঁস পাওয়া খুবই বিরল বাংলাদেশের জন্য। বিগত কয়েক বছর ধরে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ধীরে ধীরে আসা শুরু করছে রাজহাঁস। উপকূলের সমুদ্রের পাড়ে যেসব পাখি থাকতো সেইসব প্রজাতির সৈকত (লালপা, গুলিন্দা, জৌরালি) পাখির দেখা মিলেছে অনেক বেশি। তন্মধ্যে জৌরালি পাখি সাড়ে ৩ হাজারসহ সব সৈকত পাখি মিলে সংখ্যা প্রায় ৭ হাজারের বেশি।

সূত্র জানায়, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা এবং সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে হাকালুকি হাওর বিস্তৃত। এর আয়তন প্রায় ২৮ হাজার হেক্টর। ১৯৯৯ সালে সরকার হাকালুকি হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ বা ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া) ঘোষণা করে। হাওরে ছোট বড় প্রায় ২৩৮টি বিল রয়েছে। বার্ড ক্লাব ও আইইউসিএন’র পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ২০ বছরে সারা বাংলাদেশে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা কমেছে ৩৫ শতাংশ। হাকালুকিতে কমেছে ৪৫ শতাংশ। ২০০০ সালের আগে হাওরে বিচরণ করতো প্রায় ৭৫-৮০ হাজার পাখি। তার ৮০ শতাংশই হাকালুকি হাওরে ছিলো। ২০২৪ সালে হাকালুকি হাওরে পাখি শুমারি হয়নি। এর আগে ২০২৩ সালের শুমারিতে হাকালুকি হাওরে ৫২ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৭৭৮টি, ২০২২ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৬ হাজার ৫০১টি, ২০২১ সালে ৪৫ প্রজাতির ২৪ হাজার ৫৫১টি, ২০২০ সালে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি, ২০১৯ সালে ৫১ প্রজাতির ৩৭ হাজার ৯৩১টি, ২০১৮ সালে ৪৪ প্রজাতির ৪৫ হাজার ১০০টি, ২০১৭ সালে ৫০ প্রজাতির ৫৮ হাজার ২৮১টি জলচর পাখির দেখা মিলেছিল।

হাওর অঞ্চলে পাখির সংখ্যা কমে যাওয়া ও মাছের উৎপাদন বাড়ানোর কারণ সম্পর্কে ব্যাখ্যা দিয়ে পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক বলেন, ক্রমাগত অবস্থায় হাওরে পাখির সংখ্যা কমছে। শুধু হাকালুকি হাওরে নয়, কয়েক বছর ধরে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই পাখির সংখ্যা কমে আসছে। এর মূল দুটি কারণ হলো পাখির আবাসস্থল কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য পাখির আবাসস্থল কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। আর বৈশ্বিক উষ্ণতা পাখির জীবনযাত্রায় প্রভাব পড়ছে। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে হলে পাখিদের আবাসস্থল রক্ষার কোনো বিকল্প নেই। শীতকালে পাখি পরিযায়ী হয়ে বিভিন্ন দেশ থেকে খাবারের সন্ধানে ছুঁটে আসে বাংলাদেশে। আশ্রয় হিসেবে বেছে নেয়ে হাকালুকি হাওরের মতো জলাশয় গুলোকে। হাওরে আগে মাছের উৎপাদন বাড়াতে হবে, অভয়াশ্রম তৈরি করে সেটির পরিবেশ ঠিক করতে হবে। তাহলে হাওরে পাখি আসবে। তিনি মনে করেন, হাওর অঞ্চলে কৃষকরা অবাধে ধানসহ অন্যান্য কৃষিকাজে কীটনাশক ব্যবহার করছেন যার প্রভাব পড়ছে হাওরেও। মাছের প্রধান খাবার ফড়িং। এখন হাওরে সেই ফড়িং দেখা মিলে না। কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ফড়িংসহ সকল প্রকার পোকামাকড় ধ্বংস হচ্ছে। কীটনাশক ব্যবহারের ফলে কৃষকের জমির মাটির উর্বরতা বাড়ছে, ফলন হচ্ছে ঠিক কিন্তু বৃষ্টি হওয়ার পর সেই পানি হাওরে গিয়ে মিশছে। কৃষক হাওরে ধান একবছর ভালো পাচ্ছেন কিন্তু হাজার হাজার মণ মাছ নষ্ট হচ্ছে এর দায়ভার কে নেবে? কীটনাশকের কারণে হাওরে মাছের প্রধান খাবার ফড়িংসহ পোকামাকড় মারা যাচ্ছে। তাই মাছও কমে যাচ্ছে। আমাদের মাছের জন্মস্থান হাওরকে রক্ষা করতে হবে। কারণ এই মাছ দেশের মানুষের চাহিদা মিটাচ্ছে। আমরা মাছের প্রজনন ক্ষতি করছি বোকামি বা অজ্ঞতার কারণে। প্রাকৃতিক মাছ এক দশমাংশ নেই। হাওরে অন্তত ২০-৩০টি বিলকে শীতকালের জন্য সুরক্ষিত রাখতে হবে সেখানে পাহারাদার বসিয়ে। যেখানে কোন মাছ ধরা যাবেনা। ওই সময় ওইসব বিলে মাছের প্রজনেনর সুযোগ দিতে হবে।

তিনি বলেন, হাওরে সচেতনতা ও পরিকল্পনার অভাবে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকার মৎস্য সম্পদের ক্ষতি হচ্ছে, আমরা কেউ এসব নিয়ে কথা বলিনা। বিগত সময়ে হাকালুকি হাওরে সরকার ১২-১৫টি বিলকে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষনা করেছিল। কিন্তু পাখি শুমারি চলাকালে দেখা যায় বিলগুলো শুকনো রয়েছে। মাছের নিরাপদ অভয়াশ্রমের জন্য কোন কাজ পরিকল্পনামত করা হয়নি। কাগজে-কলমে সব ঠিক হয়তো রয়েছে। এই বিলগুলো খুঁড়ে পানি রাখা দরকার ছিল। হাকালুকির হাওরখাল বিলকে ১০ বছর আগে মৎস্য অভয়াশ্রম ঘোষনা করেছিল সরকার। কিন্তু এই বিল এখনো কেন শুকনো থাকতে হবে। এসব বিষয় তদারকির দায়িত্ব সরকারের মৎস্য বিভাগের। তাদের অবহেলা ও গাফিলতির কারণে মৎস্য অভয়াশ্রম সঠিকভাবে তৈরি হচ্ছেনা। এজন্য এই কাজের সরকারের মৎস্য বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতন থেকে এগিয়ে আসতে হবে। তাহলেই হাওরে মাছের উৎপাদন বাড়বে এবং পাখির সংখ্যাও বাড়বে।

কুলাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মহিউদ্দিন বলেন, বিস্তীর্ণ হাকালুকি হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। হাকালুকি হাওরের পরিবেশ যাতে বিনষ্ট না হয় সে বিষয়ে আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তিনি বলেন, হাকালুকির কুলাউড়া অংশে কাংলি বিল নামে একটি মাছের অভয়াশ্রম রয়েছে। সেটিতে এখন হয়তো দীর্ঘ খড়া থাকায় পানি কম থাকতে পারে। এছাড়া নতুন করে হাওরের মেদি বিলকে অভয়াশ্রম করার প্রস্তাবনা অনুমোদন হলে মৎস্য বিভাগ একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। হাওরের মৎস্য সম্পদ রক্ষায় অবাধে কীটনাশক ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ কমিয়ে প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহারে কৃষকদের পরামর্শ দেয়ার জন্য কৃষি বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া হবে।