সিলেট প্রতিনিধি:
সিলেটের সীমান্তবর্তী জনপদ সুনামগঞ্জের ছাতকে মসজিদের পবিত্র তহবিল লুটের প্রতিবাদ করায় সমাজসেবক ফজল মিয়া (৫০) হত্যাকাণ্ডের ২৪ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার প্রধান দুই অভিযুক্ত এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। চাঞ্চল্যকর এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি মাসুকসহ দুজনকে পুলিশ ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে।
তবে নিহতের বুকে বর্শা (সুলফি) দিয়ে আঘাতকারী ও কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিতকারী হিসেবে অভিযুক্ত হারুন এবং নুরই এখনো পলাতক রয়েছে। পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা গা ঢাকা দিলেও, নিহতের পরিবার ও মামলার সাক্ষীদের হয়রানি করতে একটি সাজানো পাল্টা মামলা দায়েরের পাঁয়তারা করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে নিহতের পরিবার ও এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।
সদ্য সমাপ্ত ঈদে চারিদিকে যখন আনন্দের বন্যা, তখন নিহত ফজল মিয়ার পুরান নোয়াকুট গ্রামের বাড়িতে ছিল শুধুই হাহাকার। বাবাকে হারিয়ে ফজল মিয়ার তিন মেয়ে, দুই ছেলে ও স্ত্রীর ঈদ কেটেছে চোখের পানিতে। আনন্দ-উৎসবের বদলে পরিবারটিতে চলেছে শোকের মাতম। এলাকাবাসী জানান, পিতৃহারা অবুঝ এই এতিম বাচ্চাগুলোর দিকে তাকালে চোখের পানি ধরে রাখা যায় না। অথচ যাদের বিরুদ্ধে এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ, তারা এখনো অধরা।
মামলার এজাহার ও অনুসন্ধান থেকে জানা যায়, ফজল মিয়া হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পূর্বেও গুরুতর অপরাধের রেকর্ড রয়েছে বলে সূত্র বলছে। স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, অভিযুক্ত হারুন মিয়া ২০০৫ সালের কোম্পানীগঞ্জ থানার একটি ডাকাতি মামলার (মামলা নং- ০৯) ১০ বছরের সাজাপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন, যা বর্তমানে উচ্চ আদালতে স্থগিত (স্টে) রয়েছে বলে জানা গেছে। অন্যদিকে, ৩নং আসামি নুরই মিয়া ২০০১ সালের চাঞ্চল্যকর জমির আলী হত্যা মামলারও (মামলা নং- ০৮) এজাহারভুক্ত আসামি ছিলেন, যা পরবর্তীতে আপস-মীমাংসার মাধ্যমে শেষ হয়েছিল বলে জানা যায়।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, অতীতে খুনের মামলা আপস করে পার পেয়ে যাওয়ার কারণেই অভিযুক্তরা এবারও ফজল হত্যার পর পাল্টা মামলা দিয়ে নিহতের পরিবারকে আপসে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে।
অতীত অপরাধের এমন গুরুতর রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও প্রধান অভিযুক্তরা কীভাবে দীর্ঘ ২৪ দিন পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে পুরান নোয়াকুট জামে মসজিদের ৫ লক্ষ টাকা আত্মসাতের প্রতিবাদ করায় ফজল মিয়াকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে মাসুক ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় নিহতের ভাই আলতাব হোসেন বাদী হয়ে ৪৬ জনের নাম উল্লেখ করে ছাতক থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
খুনিদের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে গত ১০ মার্চ ছনবাড়ী বাজারে বিজিবি ক্যাম্পের সামনে বিশাল মানববন্ধনও করেছিলেন গ্রামবাসী।
এতিমদের হাহাকার নিয়ে পুরান নোয়াকুট গ্রামের বিশিষ্ট মুরুব্বি কাচা মিয়া হতাশা ব্যক্ত করে বলেন, ‘ঈদের দিন এতিম বাচ্চাগুলোর দিকে আমরা তাকাতে পারিনি। অথচ অভিযুক্তরা এখনো পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে।’
গাংপার নোয়াকুট গ্রামের প্রবীণ মুরুব্বি আব্দুল জব্বার খোকন অভিযোগ করে জানান, ‘নুরই আগেও একটি খুনের মামলার আসামি। আর হারুন একটি ডাকাতি মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি। সে হাইকোর্ট থেকে মামলাটি ‘স্টে’ করে রেখে এলাকায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়িয়ে এই জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড মেম্বার ময়না মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ‘নিজেদের বাঁচাতে অভিযুক্তরা নিহতের পরিবারের নামে যে লুটপাটের পাল্টা মামলা দেওয়ার চেষ্টা করছে, তা সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বানোয়াট। ঘটনার দিন এলাকায় এমন কোনো লুটপাটের ঘটনাই ঘটেনি।’
এ বিষয়ে ১নং ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুফি আলম সুহেল বলেন, ‘মসজিদের পবিত্র টাকা রক্ষা করতেই ফজল মিয়া খুন হন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আগেও গুরুতর অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। এখন নিজেদের অপরাধ ঢাকতে তারা একটি কাউন্টার (পাল্টা) মামলা দিয়ে মামলার সাক্ষীদের হয়রানি করতে চাচ্ছে। মূল বাদী ও নিহতের পরিবারকে আর্থ-মানসিকভাবে চরম কষ্ট দিতেই এই মিথ্যা মামলার পাঁয়তারা চলছে।’
দীর্ঘ ২৪ দিন পার হলেও প্রধান অভিযুক্তদের ধরতে না পারায় পুলিশের অভিযান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন উঠলেও, পুলিশ প্রশাসন আসামিদের গ্রেফতারে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ফজল হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) এসআই আব্দুর রহিম প্রতিবেদককে জানান, ‘মামলার অন্যতম আসামি মাসুক ও কাদিরকে আমরা ধরেছি। গা ঢাকা দিয়ে থাকা অন্য আসামিদের ধরতে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা চলছে। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় তাদের অবস্থান শনাক্ত করে খুব দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।’
সার্বিক বিষয়ে ছাতক থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মিজানুর রহমান প্রতিবেদককে বলেন, ‘আমাদের একাধিক টিম ও বিভিন্ন সোর্স কাজে লাগিয়ে পলাতক আসামিদের ধরতে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি খুব দ্রুতই তারা ধরা পড়বে।’
অভিযুক্তদের দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলার বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে ওসি বলেন, পাল্টা মামলার কোনো কপি এখনো আমাদের কাছে আসেনি, এ ধরনের কিছু পাওয়া গেলে যাচাই করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’


আরও পড়ুন
পদ্মায় বাস দুর্ঘটনা: ৪৫ যাত্রীসহ বাস নদীতে, ২ জনের মরদেহ উদ্ধার
কালীগঞ্জে ইয়াবা ও চোলাই মদসহ গ্রেপ্তার ৮
লক্ষ্মীপুর চন্দ্রগঞ্জে দুই গ্রুপের গোলাগুলি, পথচারী গুলিবিদ্ধ