Saturday, March 28th, 2026, 3:18 pm

তেলের ব্যারেল ১২০ ডলার ছাড়ালে বছরে অতিরিক্ত খরচ হবে ৬১০০০ কোটি টাকা

 

বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর বড় ধরনের চাপ পড়ার আশঙ্কা করছে গবেষকরা। তাদের মতে, তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে দেশের বার্ষিক অতিরিক্ত ব্যয় প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার হবে। আর যদি দীর্ঘ সময় ধরে দাম ১২০ ডলারের বেশি থাকে, তাহলে এই অতিরিক্ত ব্যয় ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। দেশীয় মুদ্রায় এ অর্থ প্রায় ৬১ হাজার কোটি টাকা (প্রতি ডলার ১২২ টাকা ধরে)।

গবেষকরা সতর্ক করেছেন, এমন পরিস্থিতিতে দেশের শিল্পখাত নেতিবাচক প্রভাবের মুখে পড়বে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে। তাই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় বিকল্প উৎস, বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা বেড়ে গেছে।

শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে রাজধানীর একটি হোটেলে চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়। অনুষ্ঠানে বিসিক শিল্পনগরীতে অবস্থিত এসএমই শিল্পগুলোর জ্বালানি ব্যবহার, কার্বন নিঃসরণ এবং ডিকার্বনাইজেশনের সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের প্রধান গবেষক এম জাকির হোসেন খান অনুষ্ঠানে বলেন, “বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ৯৫ শতাংশ জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ১০ ডলার বাড়লে মাসিক ব্যয় প্রায় ৮০ মিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পাবে, যা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারে পরিণত হবে। দীর্ঘ সময় ধরে দাম ১২০ ডলারের কাছাকাছি বা তার বেশি থাকলে বছরে অতিরিক্ত ৪ থেকে ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য একদিকে সংকট, অন্যদিকে সুযোগও। “এখনই যদি জ্বালানি সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া না হয়, ভবিষ্যতে এই সুযোগ হারানোর সম্ভাবনা আছে,” তিনি সতর্ক করেন।

জাকির হোসেন খান উল্লেখ করেন, জ্বালানির দাম বাড়লে সরকার দীর্ঘ সময় ভর্তুকির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না। একপর্যায়ে মূল্য সমন্বয় করতে বাধ্য হলে শিল্পখাতে ‘ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন’-এর ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এসএমই খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এই খাতের ওপর নির্ভরশীল।

তিনি আরও বলেন, গার্মেন্টসের মতো বড় শিল্পখাতও এসএমই খাতের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। তাই এই খাত দুর্বল হলে বৃহৎ শিল্পও ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।

গবেষক জানান, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ—চীন, ভারত, ভিয়েতনামসহ ইউরোপের দেশগুলো—নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে তাদের শিল্পখাতকে টেকসই করেছে। বাংলাদেশও একই পথে এগোনোর প্রয়োজন।

চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের গবেষণায় দেখা গেছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের এসএমই খাত থেকে উল্লেখযোগ্য হারে কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব। বিশেষ করে বিসিক শিল্পনগরীগুলো থেকে বছরে ১৪.০৯ মিলিয়ন টনের বেশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভব। এছাড়া, কার্বন ক্রেডিট ব্যবস্থার মাধ্যমে বছরে প্রায় ০.৪ মিলিয়ন ডলার রাজস্ব অর্জনের সম্ভাবনাও রয়েছে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলোর উদাহরণ অনুসরণ করে বাংলাদেশের এসএমই খাতে বিকেন্দ্রীভূত রুফটপ সোলার প্যানেল ব্যবহারের মাধ্যমে পরিচালন ব্যয় ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। এটি পরিবেশগত মান বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে রপ্তানি সক্ষমতাও বৃদ্ধি করবে।

দেশের মোট শিল্প ইউনিটের ৯০ শতাংশেরও বেশি এসএমই খাতের অন্তর্ভুক্ত। এই খাত শিল্পখাতের প্রায় ৮৫ শতাংশ শ্রমশক্তিকে নিয়োজিত করে এবং জিডিপিতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অবদান রাখে। তবে, এই খাত এখনও এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল, যেখানে প্রায় ৯৫ শতাংশ বিদ্যুৎ জীবাশ্ম জ্বালানিভিত্তিক। যা বিশ্ববাজারের অস্থিতিশীলতার কারণে উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।

বাংলাদেশের এনডিসি অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে জ্বালানি খাত থেকে ৬৯.৮৪ মিলিয়ন টন কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে শিল্পখাতে জ্বালানি রূপান্তর অপরিহার্য।

গবেষণায় বিসিক শিল্পনগরের চামড়া, প্লাস্টিক উৎপাদন, প্লাস্টিক প্যাকেজিং এবং হালকা প্রকৌশল—এই চারটি খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ খাতগুলোর মিলিত কার্বন নিঃসরণ বছরে প্রায় ৪৬.৯৯ মিলিয়ন টন। তবে যথাযথ প্রযুক্তি ও উদ্যোগ গ্রহণ করলে বছরে প্রায় ১৪.৯৭ মিলিয়ন টন নিঃসরণ কমানো সম্ভব।

খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চামড়া শিল্পে ১৯-৩৩ শতাংশ, হালকা প্রকৌশল শিল্পে ১৯-৩১ শতাংশ, প্লাস্টিক শিল্পে ৩৩-৪৯ শতাংশ এবং প্যাকেজিং শিল্পে ১৫-২৮ শতাংশ পর্যন্ত কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভব।

বিসিক শিল্পনগরের মাত্র ১০ শতাংশ খালি জায়গা ব্যবহার করেই প্রায় ৫৭ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। এতে বছরে ৮২,৯৬৮ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে এবং প্রায় ৫১,৪৪০.৭১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস করা সম্ভব। খালি জায়গার ব্যবহার ২০ শতাংশে উন্নীত করলে উৎপাদন ক্ষমতা বেড়ে ১১৪ মেগাওয়াটে পৌঁছাবে। তখন বছরে প্রায় ১,৬৫,৯৩৭ মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হবে, যা ১,০২,৮৮১.৪১ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড হ্রাসে সহায়ক হবে।

এনএনবাংলা/পিএইচ