দেশের শীর্ষ ছয়টি শিল্পগোষ্ঠীর বিদেশে পাচার করা অর্থ, সম্পদ শনাক্ত ও উদ্ধারে বড় উদ্যোগ নিয়েছে ব্যাংকগুলো। এ লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দেশের ১০টি ব্যাংক বহুজাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৬টি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) সই করেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মোট ৫৯টি এনডিএ করার পরিকল্পনা রয়েছে, যার বাকি চুক্তিগুলো বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন। এই উদ্যোগের সার্বিক সমন্বয় করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ব্যাংকগুলো মূলত যেসব শিল্পগোষ্ঠী ঋণ নিয়ে খেলাপি হয়েছে এবং যাদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচারের বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের সম্পদ অনুসন্ধানেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে। এনডিএর মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আগামী ৩০ জুনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলো বাণিজ্যিক চুক্তিতে যাবে, যার মাধ্যমে সরাসরি অর্থ উদ্ধারের কার্যক্রম শুরু হবে বলে জানা গেছে।
এই তালিকায় থাকা ছয়টি শিল্পগোষ্ঠী হলো—এস আলম গ্রুপ, আরামিট গ্রুপ, সিকদার গ্রুপ, বেক্সিমকো গ্রুপ, ওরিয়ন গ্রুপ ও নাসা গ্রুপ।
এসব গ্রুপের বিরুদ্ধে ব্যাংক দখল, ঋণ জালিয়াতি, আর্থিক অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ডের কারণে ইতোমধ্যে ইসলামী ধারার পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এবং কয়েকটি ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে হিমশিম খাচ্ছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, এই ছয় শিল্পগোষ্ঠীর মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩ লাখ ২৪ হাজার ৫০১ কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি হয়ে গেছে। অন্যদিকে দেশের ব্যাংক খাতে মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৬ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৩০ দশমিক ৬০ শতাংশ। ফলে পুরো ব্যাংক খাত বর্তমানে আস্থার সংকটে ভুগছে।
পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক মানের আইনি ও ব্যবসায়িক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোকে। এসব প্রতিষ্ঠান এনডিএর আওতায় গোপন তথ্য সংগ্রহ করে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করবে এবং প্রয়োজনে সেসব দেশে দেওয়ানি মামলা করে সম্পদ জব্দের প্রক্রিয়া চালাবে। উদ্ধার হওয়া অর্থের একটি অংশ পারিশ্রমিক হিসেবে পাবে এসব প্রতিষ্ঠান, ফলে ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত ব্যয় হবে না।
এই উদ্যোগের পেছনে রয়েছে সরকারের গঠিত আন্তসংস্থা টাস্কফোর্স। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনার লক্ষ্যে এই টাস্কফোর্স পুনর্গঠন করা হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের নেতৃত্বে পরিচালিত এই টাস্কফোর্সে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) একযোগে কাজ করছে।
প্রথমে ১১টি শিল্পগোষ্ঠীকে তদন্তের আওতায় আনা হলেও পরে সর্বোচ্চ খেলাপি ঋণ ও অর্থ পাচারের তথ্যের ভিত্তিতে ছয়টি গ্রুপকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্টদের কাছে থাকা মোট খেলাপি ঋণের প্রায় ৭৭ শতাংশই এই ছয় গ্রুপের দখলে রয়েছে বলে জানা গেছে।
এস আলম গ্রুপের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইসলামী ব্যাংক। এই গ্রুপের মোট ঋণ প্রায় ২ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ইতোমধ্যে একাধিক দেশে তাদের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে এবং এসব সম্পদ উদ্ধারে ইসলামী ব্যাংককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বেক্সিমকো গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশ খেলাপি। জনতা ব্যাংকসহ একাধিক ব্যাংক এই গ্রুপের কারণে ক্ষতির মুখে পড়েছে। তাদের পাচার করা সম্পদের খোঁজে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকটি এনডিএ সই হয়েছে এবং কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
আরামিট গ্রুপের ঋণ প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা, যা প্রায় সম্পূর্ণ খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্যে এই গ্রুপের সম্পদ জব্দের ঘটনাও ইতোমধ্যে ঘটেছে। একইভাবে সিকদার গ্রুপের প্রায় ১০ হাজার ২৩৩ কোটি টাকার ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে এবং তাদের বিদেশে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে।
নাসা গ্রুপের ঋণ প্রায় ৯ হাজার ২১৪ কোটি টাকা এবং এর প্রায় পুরোটা খেলাপি। অন্যদিকে ওরিয়ন গ্রুপের ঋণের পরিমাণ প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশও ঝুঁকিতে রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বৈঠকে জানানো হয়েছে, পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সমান্তরাল আইনি প্রক্রিয়া’ অনুসরণ করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে দেশে ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি বিদেশে দেওয়ানি মামলার মাধ্যমে সম্পদ জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই উদ্যোগ সফল হলে ব্যাংক খাতে আস্থা ফিরবে, খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং পাচার হওয়া বিপুল অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
দেশে হামে আরও ৪ শিশুর মৃত্যু, ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্ত ৬৮৫
হাদি হত্যা মামলা: ফয়সাল, আলমগীর ও ফিলিপ সাংমা ১৪ দিনের রিমান্ডে
বিকল্প পথে সৌদি থেকে চট্টগ্রামে আসছে আরও ১ লাখ টন তেল