Wednesday, April 8th, 2026, 1:58 pm

যুদ্ধে উভয় পক্ষেরই বিজয় দাবি, আসলে জিতলো কে?

 

এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে উভয় পক্ষই এই সংঘাতে নিজেদের বিজয় দাবি করছে।

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা প্রশমনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইরানের সিদ্ধান্ত। দেশটির সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিল দুই সপ্তাহের একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুমোদন করেছে। জানা গেছে, নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনির সম্মতিতেই এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা মেহর নিউজ এজেন্সিতে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধবিরতিকে তারা ‘ইরানের বিজয়’ হিসেবে দেখছে। তবে পরিষদ স্পষ্ট করেছে, এটি যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাপ্তি নয়; বরং স্থায়ী সমাধানের পথে একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ।

এই পুরো প্রক্রিয়ায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছে। প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এই অস্থায়ী সমঝোতা গড়ে ওঠে। ইরানের পক্ষ থেকেও পাকিস্তানের ভূমিকার প্রশংসা করা হয়েছে।

চুক্তি অনুযায়ী, স্থায়ী যুদ্ধবিরতি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। আগামী শুক্রবার (১০ এপ্রিল) থেকে এই বৈঠক শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যেখানে উভয় পক্ষের প্রতিনিধিরা মুখোমুখি বসে দীর্ঘমেয়াদি শান্তির উপায় খুঁজবেন।

অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্তের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চূড়ান্ত বিজয়’ হয়েছে বলে দাবি করেছেন। মঙ্গলবার ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানানোর পর বার্তা সংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “এটি আমাদের সম্পূর্ণ এবং সর্বাত্মক বিজয়— একদম শতভাগ।”

এর আগে মার্চের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি শান্তি প্রস্তাব পাঠান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। ইরান সেটি প্রত্যাখ্যান করলে তিনি পরে সংশোধিত একটি প্রস্তাব পাঠান, যেখানে ৪৫ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ছিল। ইরান প্রস্তাবটি পর্যালোচনা করে শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি দেয়, যা ট্রাম্পও মেনে নেন।

তবে যুদ্ধবিরতির আগে ইরানকে একাধিকবার কঠোর হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তিনি সতর্ক করে বলেন, যদি ইরান সমঝোতায় না আসে, তাহলে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্র, সেতুসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস করে দেওয়া হবে।

যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হলে সেই হুমকি বাস্তবায়ন করা হবে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে। চীন এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে পারে।”

এদিকে, হোয়াইট হাউসও এই দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতিকে যুক্তরাষ্ট্রের বিজয় হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লিভিট লিখেছেন, “এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিজয়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমাদের অসাধারণ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সাফল্য কূটনৈতিক ক্ষেত্রে বড় সুবিধা এনে দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার দলের কঠোর আলোচনার ফলেই কূটনৈতিক সমাধান ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তির পথ উন্মুক্ত হয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আকস্মিক হামলা চালায় ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি এবং ইসরায়েলকে লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা শুরু করে। এরপর থেকেই টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে সংঘাত চলতে থাকে।

আগামী ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান ১০ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যার বিস্তারিত ইতোমধ্যে সামনে এসেছে। এসব প্রস্তাবে শুধু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার নয়, মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি সম্পূর্ণ বন্ধ করার দাবিও জানানো হয়েছে।

এই যুদ্ধবিরতির ফলে প্রকৃতপক্ষে কে বিজয়ী— তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা ও বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিতভাবে বলা যায়— এই যুদ্ধবিরতি মানবতার জন্য একটি বড় স্বস্তি এবং শান্তির সম্ভাবনার নতুন দ্বার উন্মুক্ত করেছে।

এনএনবাংলা/পিএইচ