Wednesday, December 24th, 2025, 8:03 pm

ইন্টারনেট শাটডাউন চিরতরে নিষিদ্ধ করল সরকার

 

ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের সুযোগ সম্পূর্ণভাবে বাতিল করে ‘বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’ অনুমোদন দিয়েছে উপদেষ্টা পরিষদ। বুধবার (২৪ ডিসেম্বর) অনুষ্ঠিত পরিষদের ৫২তম বৈঠকে এই অধ্যাদেশের অনুমোদন দেওয়া হয়।

সংশোধিত অধ্যাদেশের মাধ্যমে নাগরিকের গোপনীয়তা সুরক্ষা জোরদার করা হয়েছে, রাষ্ট্রীয় নজরদারিতে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হয়েছে এবং বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নতুন আইনে জাতীয় টেলিযোগাযোগ পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র (এনটিএমসি) বিলুপ্ত করে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (সিআইএস)’ নামে একটি নতুন প্রতিষ্ঠান গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বৈধ ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্রে আধা-বিচারিক অনুমোদন ও সংসদীয় নজরদারি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত দমনমূলক বিধান সংশোধন করে কেবল সহিংসতার আহ্বানকে অপরাধ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশোধিত অধ্যাদেশের লক্ষ্য হলো টেলিযোগাযোগ সেবার মানবিক মানোন্নয়ন, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর সংস্কার এবং নজরদারি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এই আইন টেলিযোগাযোগ খাতকে আরও গণতান্ত্রিক, বিনিয়োগবান্ধব ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণমূলক করে তুলবে বলে আশা করা হচ্ছে।

সংশোধিত আইনের ধারা ৯৭-এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা কোনো অবস্থাতেই বন্ধ করা যাবে না। এর ফলে ভবিষ্যতে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে দেশব্যাপী কিংবা আংশিক ইন্টারনেট শাটডাউনের সুযোগ থাকছে না।

একইসঙ্গে ২০১০ সালের বিতর্কিত সংশোধনী কাঠামো থেকে সরে এসে বিটিআরসির স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসির ক্ষমতা ও কার্যপরিধির মধ্যে ভারসাম্য আনা হয়েছে। আগে সব ধরনের লাইসেন্স অনুমোদনের ক্ষমতা যেখানে মন্ত্রণালয়ের হাতে ছিল, এখন জাতীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ কিছু লাইসেন্স ইন্ডিপেন্ডেন্ট স্টাডির ভিত্তিতে মন্ত্রণালয় অনুমোদন দেবে। অন্যান্য লাইসেন্স ইস্যুর ক্ষমতা পুনরায় বিটিআরসির কাছে ন্যস্ত করা হয়েছে।

ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির নেতৃত্বে একটি ‘জবাবদিহিতা কমিটি’ গঠন করা হয়েছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যক্রম তদারক করবে।

লাইসেন্স আবেদন ও সিদ্ধান্ত প্রদানের সময়সীমা কমানো হয়েছে। পাশাপাশি পূর্ববর্তী আইনে থাকা উচ্চ ও পুনরাবৃত্তিমূলক জরিমানা হ্রাস করা হয়েছে, যা টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সরকার।

বিটিআরসির স্বচ্ছতা বাড়াতে প্রতি চার মাস অন্তর গণশুনানি আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এসব গণশুনানির সিদ্ধান্ত ও অগ্রগতি বিটিআরসির ওয়েবসাইটে প্রকাশ করতে হবে। এছাড়া কনফ্লিক্ট অব ইন্টারেস্ট রোধে ধারা ৮৭-এ নির্দিষ্ট বিধান যুক্ত করা হয়েছে।

নাগরিকের গোপনীয়তা সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। সিম ও ডিভাইস রেজিস্ট্রেশনের তথ্য ব্যবহার করে কোনো নাগরিককে নজরদারি বা হয়রানি করলে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে (ধারা ৭১)।

বহুল আলোচিত ‘স্পিচ অফেন্স’ সংক্রান্ত ধারা সংশোধন করে সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ ২০২৫-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনা হয়েছে। এখন থেকে কেবল সহিংসতার আহ্বানকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে (ধারা ৬৬ক)।

টেলিযোগাযোগ সেবায় আপিল ও সালিশ ব্যবস্থাও যুক্ত করা হয়েছে (ধারা ৮২খ), যার মাধ্যমে গ্রাহক ও অপারেটর উভয় পক্ষই আইনি প্রতিকার পেতে পারবে।

আইনানুগ ইন্টারসেপশনের সংজ্ঞা ও পরিধি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘সেন্টার ফর ইনফরমেশন সাপোর্ট (সিআইএস)’ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে (ধারা ৯৭ক)। এই কেন্দ্র ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশের মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হবে।

জাতীয় নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জরুরি প্রাণরক্ষা, বিচারিক বা তদন্ত কার্যক্রম এবং আন্তঃসীমান্ত বিষয়ে কেবল নির্দিষ্ট ও আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই ইন্টারসেপশন করা যাবে। এই ক্ষমতা আইনে নির্ধারিত সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো নিজ নিজ অধিক্ষেত্রের মধ্যে প্রয়োগ করতে পারবে।

সিআইএসে রোল-বেজড অ্যাক্সেস কন্ট্রোল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। আধা-বিচারিক কাউন্সিলের অনুমোদন ছাড়া কোনো ইন্টারসেপশন কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। সিআইএস নিজে কোনো নজরদারি পরিচালনা করবে না; এটি কেবল কারিগরি সহায়তা প্রদান করবে (ধারা ১৭ক)। ফলে রাজনৈতিক নজরদারি, অপব্যবহার ও ব্ল্যাকমেইলিং বন্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই সংশোধনের মাধ্যমে এনটিএমসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়েছে (ধারা ৯৭)।

আইনানুগ ইন্টারসেপশনের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি আধা-বিচারিক কাউন্সিল গঠন করা হয়েছে। বেআইনি ইন্টারসেপশনের বিরুদ্ধে এই কাউন্সিলে অভিযোগ দায়ের করা যাবে। কাউন্সিলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী। সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধানমন্ত্রীর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার ও স্বরাষ্ট্র সচিব।

এছাড়া সংসদীয় স্থায়ী কমিটি প্রতি বছর আইনানুগ ইন্টারসেপশন বিষয়ে একটি জাতীয় বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে। এতে ইন্টারসেপশনের ক্ষেত্র, বাজেট ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে ইমেজ ও ভয়েস প্রোটেকশন, সিম ডেটা এবং ডিভাইস ডেটা সুরক্ষার বিধানও যুক্ত করা হয়েছে।

সরকার জানিয়েছে, সংশোধিত অধ্যাদেশের আওতায় নেওয়া সব উদ্যোগ জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন (আইটিইউ)সহ আন্তর্জাতিক উত্তম অনুশীলনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

এনএনবাংলা/