নীলফামারী প্রতিনিধি:
ভুট্টা বীজ আমদানিতে অতিরিক্ত নির্ভরতার কারণে প্রতিবছর বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার বিপুল অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে। সিন্ডিকেট ব্যবসায়ী ও ভুট্টা বীজ আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু সরকারি কর্মকর্তার স্বার্থসংশ্লিষ্টতার পাশাপাশি গবেষণা ঘাটতি ও নীতি দুর্বলতাই এই খাতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কৃষিতে দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হলেও দেশে এখনও আন্তর্জাতিক মানের ভুট্টা বীজ উৎপাদন সম্ভব না হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—সমস্যার মূল কোথায়? কেন গবেষণা কার্যক্রম জোরদার থাকার পরও বাংলাদেশ ভুট্টা বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে পারছে না?
নীলফামারীর ডোমার উপজেলার বিএডিসি খামারের ডেপুটি ডিরেক্টর মোঃ আবু তালেব মিয়া জানান, গত মৌসুমে পরীক্ষামূলকভাবে খামারের তিন থেকে চার বিঘা জমিতে হাইব্রিড জাতের বি-৩৩৫৫ ও বি-৩২৫৫ এ্যাডভান্টা ভুট্টা বীজ চাষ শুরু করা হয়। তিনি বলেন, “নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে বিশুদ্ধতা বজায় রেখে ভুট্টা বীজ উৎপাদন শুরু করলে বাংলাদেশ অবশ্যই সফল হতে পারবে। আমরা পরীক্ষামূলকভাবে অনেকাংশে সফল হয়েছি। সরকারিভাবে আরও গবেষণা ও সহযোগিতা পেলে মানসম্পন্ন বীজ উৎপাদন সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ভুট্টা বীজ উৎপাদনে গবেষণার ঘাটতি, আধুনিক গবেষণাগার ও প্রযুক্তির অভাব, বেসরকারি কোম্পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতির অভাব এই খাতের বড় অন্তরায়। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বিএডিসি সীমিত পরিসরে বীজ উৎপাদন করলেও বাজারের বিপুল চাহিদার তুলনায় তা খুবই অপ্রতুল। ফলে আমদানিনির্ভরতা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
নীলফামারী সদর উপজেলার কুন্দপুকুর ইউনিয়নের পুলহাট বাজারের ভুট্টা বীজ ব্যবসায়ী মোঃ মাহাফুজা রহমান বলেন, নীলফামারী সদর উপজেলার তিনটি ইউনিয়ন এবং দিনাজপুর জেলার খানসামা উপজেলার বেশ কয়েকটি এলাকার কৃষক তার কাছ থেকে নিয়মিত ভুট্টা বীজ সংগ্রহ করেন। তিনি জানান, প্রতি মৌসুমে গড়ে ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার ভুট্টা বীজ বিক্রি করি।
নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা মোঃ মনজুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক মানের হাইব্রিড ভুট্টা বীজ উৎপাদনের জন্য যে উন্নত প্রযুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা বিনিয়োগ ও দক্ষ বিজ্ঞানী প্রয়োজন—বাংলাদেশে তা এখনও পর্যাপ্ত নয়। বিপরীতে ভারতসহ কয়েকটি দেশ দীর্ঘদিনের গবেষণা ও পরিকল্পিত বিনিয়োগের ফলে হাইব্রিড বীজ উৎপাদনে অনেক এগিয়ে গেছে।
এছাড়া দেশে বীজ উৎপাদন ও সার্টিফিকেশন ব্যবস্থার দুর্বলতা, মূল বীজ সংরক্ষণে সমস্যা এবং ব্যক্তিনির্ভর প্রকল্প গ্রহণ ভুট্টা বীজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে কৃষকরা বাধ্য হয়ে আমদানিকৃত বীজের ওপর নির্ভর করছেন।
ভুট্টা বীজ উৎপাদন কেন্দ্র, নসিপুর (দিনাজপুর)-এর বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মাহাফুজুল হক বলেন, বাংলাদেশ যদি নিজস্ব হাইব্রিড ভুট্টা বীজ ব্যাপকভাবে উৎপাদনে সক্ষম হয়, তাহলে প্রতিবছর যে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে চলে যাচ্ছে তা দেশের মধ্যেই থাকবে। এতে কৃষি খাতে বড় ধরনের অগ্রগতি আসবে।
তিনি আরও বলেন, এজন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বারি ও বিএডিসির গবেষণা কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা এবং একটি সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি নীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।

আরও পড়ুন
উলিপুরে ভ্রাম্যমান আদালতে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা
ভাঙ্গুড়ায় প্রচন্ড শীতেও মধু সংগ্রহ করছেন মৌ খামারীরা
বোরহানউদ্দিনে ৯৫০ পিস ইয়াবাসহ মাদক পাচারকারী গ্রেফরার