Wednesday, January 7th, 2026, 8:50 pm

নির্বাচন কমিশনকেও গণভোটের প্রচারে মাঠে নামতে হবে: উপদেষ্টা সাখাওয়াত

 

জুলাই জাতীয় সনদের ওপর গণভোট বিষয়ে জনগণকে সচেতন করার দায়িত্ব শুধু অন্তর্বর্তী সরকার একা নিলে নানা প্রশ্ন উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ভূমিকার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, গণভোট নিয়ে নির্বাচন কমিশনকেও মাঠপর্যায়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা সরকার দেবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

বুধবার (৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর তোপখানা রোডে সিরডাপের এ টি এম শামসুল হক মিলনায়তনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন তিনি। ‘গণভোট ২০২৬: কী ও কেন?’ শীর্ষক এ আলোচনা সভার আয়োজন করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন এম সাখাওয়াত হোসেন।

বৈঠকে উপদেষ্টা বলেন, রাজনৈতিক দলগুলো আগের মতোই রাজনীতি চালাতে চায়, নাকি পরিবর্তনের পথে হাঁটতে চায়—সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো বার্তা এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। যেসব বড় দল ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা রাখে, তাদের পক্ষ থেকেও সংস্কারের বিষয়ে দৃঢ় অঙ্গীকার শোনা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, দেশ একটি বড় বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে গেছে। একটি শক্তিশালী সরকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় কাঠামো, সমাজ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সবকিছুই তখন ভেঙে পড়ে। পুরো ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে ছিল এক ধরনের মায়ার ওপর। সে সময় ভিন্নমত পোষণ করলে গুম, খুন, কারাবরণ কিংবা সামাজিক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার শিকার হতে হতো।

তিনি প্রশ্ন তোলেন, এখন আমরা কী চাইছি—আগের সেই পরিস্থিতিতে ফিরে যেতে? গণতন্ত্রের কথা বলতে বলতে আমরা কি আবার একনায়কতন্ত্রের পথে হাঁটছি? ভবিষ্যতে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে কি না, ভোটকেন্দ্র দখল হবে কি না, কিংবা ওপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত আবার আসবে কি না—এসব প্রশ্ন সামনে রয়েছে।

আগের মতো ব্যবস্থা আর না চাইলে সংস্কার ছাড়া বিকল্প নেই উল্লেখ করে এম সাখাওয়াত হোসেন বলেন, সেই সংস্কারের জন্য গণভোট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সেটি বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নির্ভর করছে মূলত ভোটারদের ওপর। নির্বাচনের আর এক মাস বাকি। সরকার যতটুকু প্রচার করছে, সেটুকুই দৃশ্যমান হচ্ছে।

২০০৭ সালে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত গঠনের দায়িত্ব শুধু সরকারের নয়, নির্বাচন কমিশনেরও। এবারের নির্বাচনে কমিশনের দায়িত্ব হবে ভোট গ্রহণের পাশাপাশি জনগণকে গণভোট কী, কীভাবে এটি অনুষ্ঠিত হবে—তা পরিষ্কারভাবে বোঝানো। তিনি নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করেন, গণভোট নিয়ে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে এবং প্রয়োজনে অন্যান্য সংগঠনের সহায়তা নিতে। কারণ এই কাজ শুধু সরকার করলে নানা বিতর্ক তৈরি হতে পারে।

নাগরিক সংগঠনগুলোকেও নির্বাচন কমিশনের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, ভবিষ্যতে যেন অতীতের মতো শাসনব্যবস্থা ফিরে না আসে, সে জন্য সবাইকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সরকার তার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তবে নির্বাচন কমিশনকেও গণভোট নিয়ে সক্রিয়ভাবে মাঠে নামতে হবে।

সুজনকে জেলা পর্যায়ে প্রচার চালানো এবং ২০০৭ সালের মতো অন্যান্য সংগঠনকে সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, গণভোটের বিষয়টি জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে সুজনের মতো সংগঠনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা আরও শক্তিশালী হওয়া দরকার বলে তিনি ব্যক্তিগতভাবে মনে করেন।

উপদেষ্টার বক্তব্যের পর সুজনের প্রধান নির্বাহী বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ২০০৭-০৮ সালের অভিজ্ঞতার আলোকে এবারও তারা গণভোটের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন। বিশেষ করে তরুণ ও নারীদের সংগঠিত করার চেষ্টা চলছে। তিনি বলেন, গণভোট আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত, তাই আমরা এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখব।

‘দলগুলোর অবস্থান স্পষ্ট হওয়া জরুরি’

আলোচনার শুরুতে বদিউল আলম মজুমদার বলেন, শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে গেলেও স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থার কাঠামো রেখে গেছে। সেই কাঠামো ভাঙতে হলে সংস্কার অপরিহার্য। আবার যাতে স্বৈরশাসন ফিরে না আসে, সে জন্য সংবিধানে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন, আর সে কারণেই গণভোট আয়োজন করা হচ্ছে। তবে গণভোট নিয়ে বিভ্রান্তি ও অপপ্রচার চলছে, যা দূর করা জরুরি।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য হিসেবে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে তিন দফা আলোচনার মাধ্যমে ৮৪টি বিষয়ে ঐকমত্য হয়েছে। এর ভিত্তিতেই জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে। কিছু বিষয়ে কয়েকটি দলের ভিন্নমত থাকলেও ৮৪টির মধ্যে ৪৮টি প্রস্তাব সংবিধান সংস্কারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা বাস্তবায়নে সংবিধান পরিবর্তন প্রয়োজন। বাকি বিষয়গুলো অধ্যাদেশ বা নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে কার্যকর করা সম্ভব।

গণভোটের বিস্তারিত তুলে ধরে একটি পাওয়ার পয়েন্ট উপস্থাপনার মাধ্যমে তিনি ব্যাখ্যা করেন, সংবিধান সংস্কারের ৪৮টি প্রস্তাবের ওপর গণভোট হবে। চার ভাগে ভাগ করা হলেও ব্যালটে থাকবে একটি মাত্র প্রশ্ন—‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’। সংস্কারের পক্ষে থাকলে ভোটারকে ‘হ্যাঁ’ দিতে হবে। যেহেতু রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই সনদে স্বাক্ষর করেছে, তাই এটি মানা তাদের জন্য বাধ্যতামূলক।

তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে স্পষ্টভাবে জানাতে আহ্বান জানান—তারা গণভোটে হ্যাঁ না কি না-এর পক্ষে। তার প্রত্যাশা, দলগুলো সনদে স্বাক্ষর করার পাশাপাশি জনগণকে সচেতন করতে সক্রিয় ভূমিকা নেবে এবং নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে চলচ্চিত্র পরিচালক কাজী হায়াৎ বলেন, প্রান্তিক ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আনার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলোর বড় ভূমিকা রয়েছে। তিনি বলেন, গ্রামের নিরক্ষর নারী ভোটারের কাছে এই বার্তাটি পৌঁছাতে হবে যে, এটি তার অস্তিত্ব ও ক্ষমতা প্রকাশের সুযোগ—এই সুযোগ যেন সে অবহেলা না করে।

প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, জুলাই সনদই ফ্যাসিবাদ পুনরায় ফিরে আসা ঠেকানোর রূপরেখা। এটি অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হলে দেশ আবারও ফ্যাসিবাদের দিকে ফিরে যেতে পারে।

গোলটেবিল বৈঠকে সুজনসহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। কেউ প্রশ্ন তোলেন, কেউ মতামত দেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন সুজনের সহসভাপতি ও আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুল মতিন।

সমাপনী বক্তব্যে তিনি বলেন, রাজনৈতিক নেতাদের অবশ্যই নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে। গণভোটের পক্ষে ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে প্রচার চালালে তা কার্যকর হতে পারে। সংস্কার না হলে দেশ আবার ফ্যাসিবাদের পথে চলে যেতে পারে—এই বার্তাটি জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

এনএনবাংলা/পিএইচ