আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে একযোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। এই গণভোটের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে জুলাই জাতীয় সনদ তথা রাষ্ট্রের কাঠামোগত সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়িত হবে কি না। সরকার, রাজনৈতিক দল ও নির্বাচন কমিশন ইতোমধ্যেই গণভোটকে সামনে রেখে প্রচারণা শুরু করেছে।
গণভোটের মূল লক্ষ্য হচ্ছে—যে দল বা জোট সরকার গঠন করবে, তারা জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে বাধ্য থাকবে কি না, সেটি জনগণের সরাসরি মতের মাধ্যমে নির্ধারণ করা।
গণভোটে চারটি প্রশ্নে জনগণ ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দেবে।
‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকার সনদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করবে, আর ‘না’ জয়ী হলে সেগুলো কার্যকর হবে না এবং দেশে বর্তমান ১৯৭২ সালের সংবিধান বহাল থাকবে।
‘হ্যাঁ’ ভোটে যেসব সংস্কার কার্যকর হবে
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে জুলাই জাতীয় সনদ অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় সংস্কারের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হবে।
রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক কাঠামো
সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও পিএসসি গঠিত হবে।
সংবিধান ইচ্ছেমতো পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না; গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ক্ষেত্রে গণভোট বাধ্যতামূলক হবে।
সংসদ ও সরকারের ভারসাম্য
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন।
প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারিত হবে।
সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো হবে।
রাষ্ট্রপতি ও সংসদ সংস্কার
সংসদে একটি উচ্চকক্ষ (Upper House) গঠন হবে।
রাষ্ট্রপতি দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ইচ্ছামতো ক্ষমা দিতে পারবেন না।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে।
‘না’ ভোটে এসব প্রস্তাব কার্যকর হবে না এবং বর্তমান সাংবিধানিক কাঠামো বহাল থাকবে।
গণভোটের প্রশ্নপত্রে যা থাকছে
ভোটারদের সামনে যে প্রশ্নটি রাখা হবে তা হলো—
“আপনি কি জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫ এবং জুলাই জাতীয় সনদে লিপিবদ্ধ সংবিধান সংস্কারসংক্রান্ত নিম্নলিখিত প্রস্তাবগুলোর প্রতি সম্মতি জ্ঞাপন করছেন?”
(হ্যাঁ বা না)
এর আওতায় চারটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকবে—
১. নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো জুলাই সনদ অনুযায়ী গঠিত হবে।
২. সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট; দলগুলোর ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনে তাদের অনুমোদন প্রয়োজন হবে।
৩. নারীর প্রতিনিধিত্ব, বিরোধী দলের ভূমিকা, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা, মৌলিক অধিকার, বিচার বিভাগ ও স্থানীয় সরকারসহ ৩০টি সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়ন বাধ্যতামূলক হবে।
৪. জুলাই সনদে উল্লেখিত অন্যান্য সংস্কার দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বাস্তবায়ন করা হবে।
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সরকারের পক্ষ থেকে ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ জারি করা হবে।
এই আদেশে গণভোট, প্রশ্নপত্র ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিধান থাকবে। একই সঙ্গে গণভোট পরিচালনার জন্য একটি আইন বা অধ্যাদেশ জারি করা হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ এলে—
নতুন সংসদ নিয়মিত কার্যক্রমের পাশাপাশি সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে।
সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন হবে।
সংস্কারের ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে পিআর পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
উচ্চকক্ষের মেয়াদ নিম্নকক্ষের মেয়াদের সঙ্গে শেষ হবে।
রাজনৈতিক ও সরকারি অবস্থান
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেছেন, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে অভ্যুত্থানের পক্ষের রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে, নচেৎ দেশ বড় সংকটে পড়বে।
গণভোটে সরকার ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানিয়েছেন, সরকার জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাবে, যদিও এ নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট তাদেরই দাবি ছিল। তিনি বলেন, সংস্কার বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়া জরুরি এবং এতে ‘না’ বলার সুযোগ নেই।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, গণভোট মানে জনগণের রাষ্ট্র। ‘হ্যাঁ’ ভোট মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ বাংলাদেশ।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণায় নামছে। দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম জানিয়েছেন, এ জন্য তারা অ্যাম্বাসেডর নিয়োগ দেবে।
ইসির প্রস্তুতি
জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একই দিনে হওয়ায় নির্বাচন কমিশনকে আলাদা করে বড় কোনো পরিকল্পনা নিতে হয়নি। শুধু গণভোটের জন্য গোলাপি রঙের আলাদা ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে।
এছাড়া ভোটকেন্দ্র, রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় ও মাঠপর্যায়ের অফিসগুলোতে গণভোটসংক্রান্ত আলাদা ব্যানার ও প্রচার সামগ্রী প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
ইরানে বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৬৪৫
মোবাইল ফোন আমদানিতে শুল্ক কমেছে, কমতে পারে ফোনের দাম
ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা সব দেশের ওপর ২৫% শুল্ক আরোপের ঘোষণা ট্রাম্পের