Saturday, January 17th, 2026, 7:01 pm

ইসলামপন্থীদের ভোট ‘একবাক্সে’ আনার চেষ্টা থমকে গেল!

 

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য’ থেকে বাংলাদেশ ইসলামী আন্দোলনের সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় ধর্মভিত্তিক দলগুলোর ভোট একবাক্সে আনার উদ্যোগ কার্যত ভেস্তে গেল কি না—সে প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। দীর্ঘদিন ধরেই ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে আদর্শিক বিভাজন, পারস্পরিক অনৈক্য ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব দৃশ্যমান। ফলে এসব দল আদৌ কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে এগোতে পারে, তা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

যদিও জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তারা এখনও ‘একবাক্স নীতি’তে অনড় এবং মনে করছে—ইসলামপন্থী ভোট একত্র করার সময় শেষ হয়ে যায়নি। তবে ইসলামী আন্দোলন বলছে ভিন্ন কথা। দলটির ভাষ্য অনুযায়ী, জামায়াত আমিরের ‘ক্ষমতায় গেলে শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করা হবে না’—এমন বক্তব্য দুই দলের মধ্যকার আদর্শিক দূরত্বকে স্পষ্ট করেছে। আর এই দূরত্বই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনি জোট গঠনের পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনি ঐক্য না হলে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন—উভয় দলই ক্ষতির মুখে পড়বে। তবে তারা প্রশ্ন তুলছেন, নিজেদের মধ্যে এত প্রবল অনৈক্য থাকা সত্ত্বেও ইসলামপন্থী ভোট একবাক্সে আনার দাবি আসলে কোন বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল, তা কখনোই পরিষ্কার করা হয়নি।

বিশ্লেষকদের মতে, এবারের উদ্যোগ অন্তত ইসলামপন্থী দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করেছে। ফলে চলতি নির্বাচনে জোটবদ্ধ হওয়া সম্ভব না হলেও এই প্রচেষ্টা একেবারে শেষ হয়ে যাবে না বলেই তারা মনে করছেন।

উল্লেখ্য, শুক্রবার ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ জানায়, তারা জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে না থেকে ২৬৮ আসনে এককভাবে দলীয় প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে দলের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন,

‘ওয়ান বক্স পলিসির মাধ্যমে ইসলামপন্থি শক্তিকে এক করার যে চেষ্টা চলছিল, সেটি নিয়ে শঙ্কা তৈরি হওয়ায় ইসলামী আন্দোলন নিজস্বভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’

টানাপড়েনের সূত্রপাত যেভাবে

ইসলামপন্থী দলগুলোর ভোট একত্র করার লক্ষ্যে জোট গঠনের উদ্যোগ শুরু হয় ২০২৪ সালের আগস্টে, শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পরপরই। এই উদ্যোগের মূল চালিকাশক্তি ছিল জামায়াতে ইসলামী। পরবর্তী সময়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে বরিশালের চরমোনাইয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের সঙ্গে জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সৌজন্য সাক্ষাৎ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

সে সময় জামায়াত নেতারা জানান, ‘পাঁচ আগস্ট পরবর্তী বাস্তবতায় বিভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করতে হবে’—এই থিমকে সামনে রেখে তারা বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও ব্যক্তির সঙ্গে মতবিনিময় শুরু করেছেন, যার মূল লক্ষ্য আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন।

এরই ধারাবাহিকতায় প্রায় নয় মাস আগে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ আটটি ইসলামি দল আসন সমঝোতার ভিত্তিতে একটি নির্বাচনি মোর্চা গঠন করে। তবে ভোটের এক মাসেরও কম সময় আগে সেই জোট থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা দেয় ইসলামী আন্দোলন।

জোট গঠনের প্রক্রিয়ায় যুক্ত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আসন বণ্টন নিয়ে সমঝোতা না হওয়া এবং জামায়াতের কর্তৃত্বমূলক অবস্থান চরমোনাই পীর হিসেবে পরিচিত ইসলামী আন্দোলনের আমিরকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

বৃহস্পতিবার জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের ১০টি দল নিয়ে আসন বণ্টনের চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে জানানো হয়, ২৫৩টি আসনে জোটগত সমঝোতা হয়েছে। এর পরদিনই জামায়াত আমিরের শরিয়াহ আইন সংক্রান্ত বক্তব্য গণমাধ্যমে এলে ইসলামী আন্দোলনের ভেতরে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়।

ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন,

‘তারা আমাদের বলেছিল ক্ষমতায় গেলে ইসলামের বিধান ও শরিয়াহ আইন বাস্তবায়ন করবে। এখন তারা সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে। মৌলিক জায়গা থেকে সরে যাওয়ায় তাদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন।’

অন্যদিকে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন,

‘আমিরে জামায়াত বলেছেন, বাংলাদেশ বিদ্যমান আইন কাঠামোর মধ্যেই চলবে, যেখানে সব ধর্মের মর্যাদা রক্ষা করা হবে। বর্তমান বাস্তবতায় এই আইনই যথেষ্ট।’

আবেগের রাজনীতি বনাম বাস্তবতা

নির্বাচন সামনে রেখে সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামপন্থী ভোটারদের উদ্দেশে নানা আবেগঘন প্রচারণা চোখে পড়েছে—‘ভোট দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে’, ‘বেহেশতের টিকিট’, কিংবা ‘ঈমানের জন্য ভোট’—এ ধরনের বক্তব্য নিয়ে আলোচনা-সমালোচনাও কম হয়নি। এর মধ্যেই শরিয়াহ আইন নিয়ে জামায়াত আমিরের বক্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দেয়।

গাজী আতাউর রহমান স্বীকার করেছেন, জোট না হলে সব দলই কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তবে তার ভাষায়,

‘ইসলামের সঠিক ধারা রক্ষা করাই আমাদের মূল লক্ষ্য। সাধারণ মানুষ আমাদের ওপর যে বিশ্বাস ও আস্থা রাখে, তার মূল্য দিতে হবে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক শরীফ মুহাম্মদ মনে করেন, আওয়ামী লীগ ও তাদের ঘনিষ্ঠ বামশক্তি নির্বাচনে না থাকায় এবারের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। তিনি বলেন,

‘ইসলামপন্থী ভোটার আসলে কারা এবং কোন ভিত্তিতে এই ভোট এক বাক্সে আনার কথা বলা হয়েছিল—তা স্পষ্ট করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত জোট না হওয়ায় জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন উভয়ই ক্ষতির মুখে পড়বে।’

অন্যদিকে দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতে, ইসলামী আন্দোলন সরে গেলেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়বে না। তিনি বলেন,

‘অনেক ইসলামপন্থী দল প্রকৃত রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে গড়ে ওঠেনি। কেউ মুরিদনির্ভর, কেউ ব্যক্তিকেন্দ্রিক। জনমানুষের সঙ্গে অনেক দলের যোগাযোগ দুর্বল।’

তবে শরীফ মুহাম্মদের ধারণা, নির্বাচনি ঐক্য না হলে উভয় দলই কিছু আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে বড় ধাক্কা খেতে পারে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

এনএনবাংলা/পিএইচ