বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী এক অধ্যায়ের অবসান কি ঘনিয়ে এসেছে? শেখ হাসিনার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে এমন প্রশ্নের জবাবে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, “সম্ভবত তাই।”
আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ পায়, তবে শেখ হাসিনাকে আর দলের নেতৃত্বে দেখা নাও যেতে পারে—এমন ইঙ্গিতই দিয়েছেন তিনি।
আল জাজিরার সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন ওয়াশিংটন ডিসিতে জয়ের বাসভবনে গিয়ে এই সাক্ষাৎকারটি নেন। সেখানে জয় বলেন, “আমার মা (শেখ হাসিনা) আসলে দেশে ফিরতে চান। তিনি অবসর নিতে চান। তিনি বিদেশে থাকতে চান না।”
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর শেখ হাসিনা ভারতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে, ফলে দলটি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
আওয়ামী লীগের অধিকাংশ জ্যেষ্ঠ নেতা বর্তমানে দেশের বাইরে আত্মগোপনে রয়েছেন। দেশে অবস্থানরত অনেক নেতা-কর্মী কারাবন্দি।
দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্নের উত্তরে জয় বলেন, “অবশ্যই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ আছে। এটি দেশের সবচেয়ে পুরনো ও বড় রাজনৈতিক দল। আমাদের এখনও ৪০–৫০ শতাংশ ভোট আছে। দেশের ১৭ কোটি মানুষের মধ্যে ৬–৭ কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক।”
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ৭০ বছরের পুরনো একটি দল, যা একজন নেতার ওপর নির্ভরশীল নয়।

হাসিনাকে ছাড়া আওয়ামী লীগ?
সাংবাদিকের প্রশ্ন—শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেও কি তিনি আর রাজনীতিতে থাকবেন না? জয়ের জবাব, “না। তার বয়স হয়েছে (৭৮ বছর)। এমনিতেই এটি তার শেষ মেয়াদ হওয়ার কথা ছিল। তিনি অবসর নিতে চান।”
এ সময় ‘হাসিনা যুগের সমাপ্তি’ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হলে জয় বলেন, “সম্ভবত তাই।” তিনি আরও বলেন, “আওয়ামী লীগ তাকে সঙ্গে নিয়ে অথবা তাকে ছাড়াই চলবে। কেউ তো চিরদিন বাঁচে না।”
নিষেধাজ্ঞার আয়রনি ও নির্বাচনী বিতর্ক
শ্রীনিবাসন জৈন আওয়ামী লীগের সময়ের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন ও বর্তমান নিষেধাজ্ঞার প্রসঙ্গ তুলে ধরলে জয় বলেন, আওয়ামী লীগ কখনো কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের সিদ্ধান্তে।
২০১৮ সালের নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি দাবি করেন, “আমাদের ও আমেরিকান জরিপ—সবই দেখাচ্ছিল আমরা বিপুল ব্যবধানে জিতব। অনিয়মের কোনো প্রয়োজন ছিল না।”
২০২৪ সালের নির্বাচনেও কারচুপির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, বিরোধীদের নির্বাচন বর্জন ছিল ‘দুর্ভাগ্যজনক’।
সহিংসতার অভিযোগ ও জয়ের ব্যাখ্যা
আগের এক সাক্ষাৎকারে ‘আওয়ামী লীগ ছাড়া নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না’—এমন বক্তব্য প্রসঙ্গে জয় বলেন, “আমি সহিংসতার হুমকি দিইনি। বলেছি, যদি কাউকে সহিংসভাবে দমন করা হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সহিংসতা হবে।”
তিনি দাবি করেন, জুলাই আন্দোলনের পর থেকে শত শত আওয়ামী লীগ কর্মী নিহত, ৩০ জনের বেশি হেফাজতে মৃত্যু এবং সম্প্রতি এক হিন্দু নেতা কারাগারে নিহত হয়েছেন।
হাদি হত্যা ও ছাত্রলীগ প্রসঙ্গ
ঢাকায় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরীফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ অস্বীকার করে জয় বলেন, “এই মুহূর্তে আমাদের যদি হত্যাকাণ্ড ঘটানোর সক্ষমতা থাকত, তাহলে এই রেজিম কি টিকে থাকত?”
ফয়সাল করিম মাসুদের ছাত্রলীগ সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সে কতটা যুক্ত ছিল, তার কোনো পদ ছিল কি না—সবকিছুর দায় আওয়ামী লীগের ওপর চাপানো হচ্ছে।”
সাক্ষাৎকারের শেষ দিকে জয় বলেন, “আমরা এখন মানুষকে বলছি—এই কারচুপিপূর্ণ নির্বাচনে যেন তারা ভোট না দেয়। সেটাই আমাদের প্রচারণা।”
শেখ হাসিনার অবসর, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে সম্ভাব্য নতুন অধ্যায়—সব মিলিয়ে এই সাক্ষাৎকার নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের শান্তি পর্ষদ আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু, যোগ দিল ২০টির বেশি দেশ
বিশ্বকাপ খেলতে ভারতে যাবে না বাংলাদেশ: যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা
বাংলাদেশের ভোটের লড়াইয়ের নতুন ময়দান, টিকটক-ফেসবুক-ইউটিউব