Saturday, January 24th, 2026, 4:29 pm

আগামী সরকারের জন্য ৭ দফা ‘পরিবেশ অ্যাজেন্ডা’ দিলেন রিজওয়ানা হাসান

 

স্বাধীনতার ৫৪ বছরে সৃষ্ট অব্যবস্থাপনা, দূষণ ও পরিবেশগত সংকট দেড় বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষে পুরোপুরি সমাধান করা বাস্তবসম্মত নয়—এ কথা উল্লেখ করে আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য সাত দফা একটি সুসংহত ‘পরিবেশ অ্যাজেন্ডা’ তুলে ধরেছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিনের জমে ওঠা সমস্যার পাহাড় এক রাতেই সরানো সম্ভব নয়। তবে বর্তমান সরকার একটি স্বচ্ছ, কাঠামোগত ও বাস্তবভিত্তিক সমাধান প্রক্রিয়ার ভিত্তি তৈরি করছে, যা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব ভবিষ্যৎ সরকারের।

শনিবার (২৪ জানুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে আয়োজিত এক নাগরিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

পরিবেশ উপদেষ্টা বলেন, চীন যে সমস্যা ১০ বছরে সমাধান করতে পারে না, তা বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেড় বছরে প্রত্যাশা করা যুক্তিযুক্ত নয়। তবে দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবসম্মত অগ্রাধিকার নির্ধারণ এবং শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার।

নির্বাচনী ইশতেহার প্রসঙ্গে রিজওয়ানা হাসান বলেন, ইশতেহারে ভালো কথার অভাব নেই, কিন্তু বড় সংকট বাস্তবায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ না থাকা। রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তার বাইরে এসে দায়বদ্ধ আচরণের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিশ্রুতি দেওয়া সহজ হলেও তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে—সেটা স্পষ্ট না হলে জনগণের কোনো লাভ হয় না।

উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, গত চারটি নির্বাচনে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার নিয়ে বারবার অঙ্গীকার করা হলেও বাস্তবে সেগুলোর বাস্তবায়ন আজও হয়নি। এই অভিজ্ঞতা থেকেই শিক্ষা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

আগামী সরকারের জন্য সাত দফা পরিবেশ অ্যাজেন্ডা

ভবিষ্যৎ সরকারের করণীয় হিসেবে সাতটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রস্তাব দেন উপদেষ্টা—

১. বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ : ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লকের ব্যবহার বাড়ানো এবং জ্বালানি মান ইউরো-৪ থেকে ইউরো-৬ এ উন্নীত করা।

২. শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ : হর্ন ব্যবহারের সংস্কৃতি বদলাতে পুলিশ সার্জেন্টদের সরাসরি জরিমানার ক্ষমতা দিয়ে নতুন বিধিমালা কার্যকর করা।

৩. বন পুনরুদ্ধার : দখলকৃত বনভূমি উদ্ধার এবং বন সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী প্রাকৃতিক বন অন্য কাজে ব্যবহার বন্ধ রাখা।

৪. বন্যপ্রাণী কল্যাণ : বন্যপ্রাণী ও বননির্ভর জনগোষ্ঠীর অধিকার রক্ষায় আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ।

৫. শিল্প দূষণ রোধ : অনলাইন মনিটরিংয়ের মাধ্যমে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।

৬. আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা : তিস্তা ও পদ্মা ব্যারেজসহ বড় প্রকল্পগুলোর ফিজিবিলিটি ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা।

৭. বর্জ্য ব্যবস্থাপনা : বিভাগীয় শহরগুলোতে উৎসস্থলে বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে সার উৎপাদন।

রিজওয়ানা হাসান জানান, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে প্রথমবারের মতো যানবাহন স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ স্ক্র্যাপ পলিসি প্রণয়ন করা হয়েছে। পাশাপাশি দূষণ কমাতে ১০০টি ইলেকট্রিক বাস আমদানির একটি প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে ২০ হাজার একর বনভূমি এবং কক্সবাজারে প্রশাসনের ট্রেনিং সেন্টারের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৭০০ একর বনভূমি উদ্ধার করা হয়েছে।

সাভারকে ‘ডিগ্রেডেড এয়ারশেড’ ঘোষণা করা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি জানান, অবৈধ ইটভাটা উচ্ছেদে নিয়মিত অভিযান চলছে।

বুড়িগঙ্গা নদীর নিচে ৫ থেকে ৭ মিটার পলিথিন স্তরের কথা তুলে ধরে উপদেষ্টা বলেন, পলিথিনমুক্ত বাজার গড়তে শুধু সরকারের দিকে তাকিয়ে থাকলে হবে না—জনগণকেও আচরণ পরিবর্তন করতে হবে।

ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি সতর্কবার্তা দিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে সহযোগিতা করা হবে, তবে পরিবেশবিরোধী কর্মকাণ্ড হলে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।

তিনি আশা প্রকাশ করেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে পরিবেশগত ভিত্তি তৈরি করছে, আগামী সরকার তা আরও শক্তিশালী করবে এবং পরিবেশকে উন্নয়নের প্রান্তিক বিষয় নয়, বরং রাষ্ট্রীয় মূল অ্যাজেন্ডায় পরিণত করবে।

এনএনবাংলা/পিএইচ