Monday, January 26th, 2026, 12:55 am

আদানি বাড়াচ্ছে আর্থিক চাপ, জ্বালানি খাতের ‘বিদ্যুৎ দানব’ সামিট: জাতীয় কমিটি

 

ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গে ‘অনিয়মে ভরপুর’ ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সহযোগিতায় সামিট গ্রুপ জ্বালানি খাতে ‘বিদ্যুৎ দানব’ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে সরকারের জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি)।

জাতীয় কমিটির প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সামিটের পাশাপাশি চট্টগ্রামভিত্তিক আলোচিত ব্যবসায়ী গ্রুপ এস আলমের এসএস পাওয়ারের সঙ্গে করা অসম চুক্তির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও বিপুল ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডকে (পিডিবি)।

বছরে শত শত মিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত ব্যয়

রোববার ( ২৫ জানুয়ারি) বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি জানায়, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিদ্যুৎ আমদানি চুক্তির ফলে বাংলাদেশকে প্রতি বছর ৪০০ থেকে ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। কমিটি গত ২০ জানুয়ারি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টার কাছে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। কমিটির মতে, এই অতিরিক্ত ব্যয় দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় অর্থনীতি, শিল্পখাত ও রাজস্ব স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

জরুরি আইনেই তৈরি হয়েছে সংকট

কমিটি জানায়, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০ দীর্ঘদিন কার্যকর থাকার ফলে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র ও স্বচ্ছ মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সুযোগে কিছু বড় চুক্তিতে অতিমূল্য নির্ধারণ ও ঝুঁকি একতরফাভাবে রাষ্ট্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইউনিট বিদ্যুতের দাম বেড়ে ১৪.৮৭ সেন্ট

জাতীয় কমিটির তথ্য অনুযায়ী, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তিতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম অন্যান্য উৎসের তুলনায় ৪ থেকে ৫ সেন্ট বেশি নির্ধারিত হয়েছে। চুক্তির শুরুতে ইউনিটপ্রতি মূল্য ছিল ৮ দশমিক ৬১ সেন্ট, যা বিভিন্ন শর্তের কারণে ২০২৫ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪ দশমিক ৮৭ সেন্টে। চুক্তিটি বহাল থাকলে আগামী ২৫ বছর ধরে এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করতে হবে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ, বাজেট ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে সতর্ক করেছে কমিটি।

পিডিবির লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির সদস্য ও বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ২০১১ থেকে ২০২৪ অর্থবছরের মধ্যে স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদকদের (আইপিপি) প্রতি সরকারের পরিশোধ ১১ গুণ বেড়েছে, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদন বেড়েছে মাত্র চার গুণ। এর ফলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) বর্তমানে বছরে ৫০ হাজার কোটি টাকার বেশি লোকসান দিচ্ছে, যা ২০২৫ অর্থবছরে গিয়ে ৫৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়াতে পারে।

বিদ্যুতের দাম বাড়ালে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শিল্পখাত

ড. জাহিদ হোসেন আরও বলেন, ঘাটতি পুষিয়ে নিতে পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৮৬ শতাংশ বাড়াতে হলে বাংলাদেশে বিদ্যুতের দাম ভারত, চীন, ভিয়েতনাম ও শ্রীলঙ্কার চেয়েও বেশি হয়ে যাবে। এতে রপ্তানি, বিনিয়োগ ও শিল্পখাত আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে।

আদানি চুক্তিতে দুর্নীতির প্রমাণ, সালিশিতে যাওয়ার তাগিদ

জাতীয় কমিটির সদস্য অধ্যাপক মোশতাক হোসেন খান বলেন, আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তিতে গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেছে। এসব তথ্য আদানিকে জানিয়ে তাদের ব্যাখ্যা চাওয়া উচিত এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে সিঙ্গাপুরে আন্তর্জাতিক সালিশি মামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন। বিলম্ব হলে আইনি কারণে বাংলাদেশের মামলা দুর্বল হয়ে যেতে পারে।

তিনি জানান, চুক্তির সঙ্গে জড়িত ৭–৮ জনের অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে, যেখানে কয়েক মিলিয়ন ডলারের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ট্রাভেল ডকুমেন্টসহ সব প্রমাণ দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) দেওয়া হয়েছে এবং দুদক ইতোমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে।

সংকট অনিবার্য নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ফল

জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রধান ও হাইকোর্ট বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়; বরং এটি নির্দিষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের ফল। এখন রাষ্ট্রকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে—দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি বহন করবে, নাকি জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেবে।

উল্লেখ্য, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের এই জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন— বুয়েটের ইইই বিভাগের অধ্যাপক আবদুল হাসিব চৌধুরী ও কেপিএমজি বাংলাদেশের সাবেক সিওও আলী আশরাফ।

এনএনবাংলা/