Monday, January 26th, 2026, 7:43 pm

ইন্টারনেট শাটডাউনে ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটে ইরান

 

দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও ভয়াবহ মুদ্রা অবমূল্যায়নের চাপে থাকা ইরানের অর্থনীতিতে নতুন করে বড় ধাক্কা দিয়েছে টানা ইন্টারনেট শাটডাউন। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে বৈশ্বিক ইন্টারনেট থেকে প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় দেশটির অনলাইন ব্যবসা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে সাধারণ মানুষের জীবিকা ও দৈনন্দিন জীবনে।

সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে ইন্টারনেট বন্ধ করার সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন ক্ষুদ্র অনলাইন উদ্যোক্তারা। সোমবার (২৬ জানুয়ারি) আমিরাতভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল জানায়, বহু ইরানি পরিবারের কাছে অনলাইন ব্যবসাই ছিল শেষ ভরসা।

ইনস্টাগ্রামে পর্দা বিক্রি করা এক ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে তিনি একটি অর্ডারও পাননি। তিনি বলেন, “আমাদের কোনো দোকান নেই। ঘর থেকেই অনলাইনে ব্যবসা চালাই। ইন্টারনেটই ছিল একমাত্র ভরসা।”
এই অভিজ্ঞতা এখন ইরানের হাজারো অনলাইন বিক্রেতার বাস্তবতা।

ইরানের ডিজিটাল অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের ওপর। ফারসি গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটির বেশি। যদিও প্ল্যাটফর্মটি ইরানে আনুষ্ঠানিকভাবে নিষিদ্ধ, তবুও ভিপিএনের মাধ্যমে এটি অনলাইন বাজারের মেরুদণ্ডে পরিণত হয়েছে।

৩৪ বছর বয়সী এক নারী ঘরে বসে কুকিজ ও পেস্ট্রি তৈরি করে অনলাইনে বিক্রি করতেন। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তিনি বলেন, “বেতন দিয়ে সংসার চলে না বলেই অনলাইন ব্যবসা শুরু করেছিলাম। এখন সেই সামান্য আশাটুকুও নেই।”

ইন্টারনেট বন্ধের আগে অনলাইন দোকানগুলোতে তুলনামূলক কম দামে পণ্য পাওয়া যেত, যা ৪২ শতাংশ মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা সাধারণ মানুষের জন্য ছিল বড় স্বস্তি। এক তেহরানি ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা পরিস্থিতি ভালো করার আশায় প্রতিবাদে নেমেছিলাম। এখন আমাদের সন্ত্রাসী তকমা দিয়ে স্বাভাবিকভাবে বাঁচার শেষ আশাটুকুও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”

ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানায়, শাটডাউনের কারণে ইরানের প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে ৩ কোটি ৭০ লাখ ডলারের বেশি। তবে ইরান সরকারের দাবি, দৈনিক ক্ষতি ৪৩ লাখ ডলারের বেশি নয়।

দেশটির উপ-তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী এহসান চিতসাজ স্বীকার করেছেন, ইন্টারনেট বন্ধে ডিজিটাল বিজ্ঞাপন ও অনলাইন পর্যটন খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনিশ্চয়তার কারণে কেউ দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বা বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছে না বলেও তিনি জানান।

জাতীয় তথ্য নেটওয়ার্কের আওতায় কিছু দেশীয় অ্যাপ চালু থাকলেও সেগুলোর অবস্থাও শোচনীয়। জনপ্রিয় রাইড শেয়ারিং অ্যাপ ‘স্ন্যাপ’ জানিয়েছে, ব্যবহারকারীর চাহিদা ৮০ শতাংশ কমে গেছে। প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ ৫৭ হাজার ডলার রাজস্ব হারাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। স্ন্যাপ সতর্ক করে বলেছে, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রযুক্তি খাত সংকুচিত হবে এবং দক্ষ জনশক্তি দেশ ছাড়তে বাধ্য হবে।

হোয়াটসঅ্যাপ ও ইনস্টাগ্রামের বিকল্প হিসেবে রাষ্ট্র-ঘনিষ্ঠ দেশীয় অ্যাপগুলোর প্রচার বাড়ানো হলেও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে সেগুলো। গোপনীয়তা ও তথ্য নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কারণে অনেকেই এসব প্ল্যাটফর্ম এড়িয়ে চলছেন।

এর আগে ২০১৯ ও ২০২২ সালেও ইরানে ইন্টারনেট শাটডাউন করা হয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থার দাবি, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ৫ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। তবে ইরান সরকারের হিসাব অনুযায়ী নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ১০০। ইন্টারনেট শাটডাউন থেকে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ক্ষতি স্পষ্ট হলেও সরকার নিরাপত্তার যুক্তিতে এ সিদ্ধান্তকে বৈধ বলে দাবি করছে। তবে ব্যবসায়ীদের মতে, এই অনিশ্চয়তাই সবচেয়ে ভয়াবহ।

এনএনবাংলা/