Thursday, January 29th, 2026, 2:22 pm

৭৮ আসনে বিএনপির বিদ্রোহী, নড়েচড়ে বসছে জামায়াত

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন অনেক আসনেই নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। দলটির বহিষ্কৃত নেতা, সাবেক এমপি ও নেতাদের পরিবারের সদস্যসহ মোট ৭৮টি আসনে স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এতে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট এবং অন্যান্য প্রার্থীদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। এই পরিস্থিতিকে সুযোগ হিসেবে দেখছে জামায়াত জোট। যদিও দলটির পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে বিষয়টি স্বীকার করা হচ্ছে না।

জামায়াত জোটের নেতারা বলছেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে নির্বাচনের হিসাব অনেক জায়গায় বদলে যেতে পারে। বিশেষ করে ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগের ৯৪টি আসনে আগে যেখানে জামায়াতের অবস্থান দুর্বল ছিল, সেখানে নতুন করে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই দুই বিভাগে ৩৫টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় জামায়াত জোট আসন সংখ্যা বাড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে।

বিএনপি এবার ধানের শীষ প্রতীকে ২৯২টি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। জোটের শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়েছে আরও ৮টি আসন। এই ২৯২ প্রার্থীর মধ্যে ৬ জন অন্য দল থেকে আসা নেতা। প্রার্থী চূড়ান্ত হওয়ার পর ৮২টি আসনে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ৯৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়ন জমা দেন। পরে কয়েকটি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থীরা নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেও প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় শেষ হওয়ায় ব্যালটে তাদের নাম ও প্রতীক থেকে গেছে। বর্তমানে ৭৮টি আসনে বিএনপির ৯২ জন বিদ্রোহী সক্রিয় রয়েছেন।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব আবদুল হালিম বলেন, দেশের যে কোনো যোগ্য নাগরিক নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন। জামায়াত জোট কাউকে বিএনপির বিদ্রোহী নয়, বরং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেই দেখছে। কোথাও কোথাও এতে সুবিধা হতে পারে, তবে জামায়াত কারও ওপর নির্ভর না করে নিজেদের শক্তি ও জনগণের সমর্থনের ওপর ভর করেই নির্বাচনে এগোচ্ছে।

অন্যদিকে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীর অভিযোগ, প্রার্থী তালিকায় ত্যাগী ও জনপ্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে নব্য, সুবিধাভোগী কিংবা দীর্ঘদিন আন্দোলনে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে স্থানীয় পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। দলীয় সতর্কতা ও বহিষ্কারেও তাদের অনেককে নিবৃত্ত করা যায়নি।

এই বিদ্রোহী প্রার্থীদের অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছেন। ফলে বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা শুধু বিরোধী দল নয়, নিজেদের দল থেকেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। অনেক আসনে জামায়াত জোট, জাতীয় পার্টি ও বাম জোটের প্রার্থীরাও রয়েছেন, যা প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, দল সবচেয়ে যোগ্য প্রার্থীদের হাতেই ধানের শীষ তুলে দিয়েছে। নির্বাচনে হার-জিত থাকবেই, জনপ্রিয় নেতারাই এগিয়ে থাকবেন—এটাই স্বাভাবিক।

আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় এবার ভোটের রাজনীতিতে জামায়াত বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। রংপুর, রাজশাহী ও খুলনা বিভাগ নিয়ে গঠিত পশ্চিমাঞ্চলের ১০৮টি আসনের মধ্যে ১০১টিতে জামায়াত প্রার্থী দিয়েছে। এই অঞ্চলের বহু আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীরা জামায়াতের পথ সহজ করেছে। রংপুর বিভাগে ৪টি, ঢাকায় ৮টি এবং খুলনায় ১১টি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।

ময়মনসিংহ, ঢাকা ও বরিশাল বিভাগ নিয়ে গঠিত মধ্যাঞ্চলের ১১৫টি আসনে জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে দুর্বল। তবে এবার এই অঞ্চলের ৩৮টি আসনে বিএনপির সক্রিয় বিদ্রোহী প্রার্থীরা জামায়াতের জন্য সুযোগ তৈরি করতে পারে। ময়মনসিংহে ১৮টি, ঢাকায় ১৭টি এবং বরিশালে ৩টি আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে।

পূর্বাঞ্চলের সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগেও জামায়াত বিএনপির তুলনায় দুর্বল হলেও এখানকার ৭৭টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

এবারের নির্বাচনে জামায়াত ২২৪টি আসনে লড়াই করছে। শরিক দলগুলোর মধ্যে আসন বণ্টন করা হয়েছে এনসিপি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, এলডিপি, এবি পার্টি, নেজামে ইসলাম, বিডিপি ও খেলাফত আন্দোলনের মধ্যে। বিএনপি-সংশ্লিষ্ট বিদ্রোহী প্রার্থী থাকা ৭৯টি আসনের মধ্যে ৪৯টিতে জামায়াত সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে।

উত্তরবঙ্গ, মধ্যাঞ্চল ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কয়েকটি আসনে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীদের কারণে জামায়াত ও তাদের শরিক দলগুলো মূল লড়াইয়ে চলে এসেছে। দিনাজপুর, গাইবান্ধা, নাটোর, নওগাঁ, পাবনা, বাগেরহাট, যশোর ও সাতক্ষীরার মতো জেলাগুলোতে এই বিভাজন জামায়াতের জয়ের সম্ভাবনা বাড়িয়েছে।

ময়মনসিংহ ও ঢাকার কয়েকটি আসনেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও বিএনপির বিদ্রোহী, কোথাও আবার জামায়াতের নিজস্ব বিদ্রোহী প্রার্থী পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। তবে সামগ্রিকভাবে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল জামায়াত জোট ও তাদের শরিকদের জন্য একাধিক আসনে জয়ের বাস্তব সুযোগ তৈরি করেছে।

সূত্র সমকাল

এনএনবাংলা/পিএইচ