আট বছর আগে নেপালে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজ বিধ্বস্তের ঘটনায় নিহত ও আহত যাত্রীদের পরিবারকে আন্তর্জাতিকভাবে নির্ধারিত দায়সীমার বাইরেও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে বলে রায় দিয়েছে কাঠমান্ডুর একটি আদালত।
নেপালের প্রভাবশালী দৈনিক কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে, গত সপ্তাহে প্রকাশিত পূর্ণাঙ্গ রায়ে আদালত উল্লেখ করেছে—এই প্রথম নেপালের এভিয়েশন ইতিহাসে কোনো এয়ারলাইনকে আন্তর্জাতিক দায়সীমার বাইরে গিয়ে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হলো।
২০১৮ সালের ভয়াবহ দুর্ঘটনা
২০১৮ সালের ১২ মার্চ ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে উড্ডয়ন করা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের সময় বিধ্বস্ত হয়।
কানাডায় তৈরি ৭৬ আসনের বোম্বার্ডিয়ার ড্যাশ ৮ কিউ-৪০০ উড়োজাহাজটিতে আগুন ধরে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ৫১ জন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন ২২ জন নেপালি, ২৮ জন বাংলাদেশি ও একজন চীনা নাগরিক।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: চরম অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণ
কাঠমান্ডু জেলা আদালত রায়ে বলেছেন, পাইলট ও ফ্লাইট অফিসারের চরম অবহেলা ও বেপরোয়া আচরণের কারণেই দুর্ঘটনাটি ঘটে। ফলে সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশনের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের দায় ক্ষতিপূরণের সীমার বাইরে পড়বে।
আদালত স্পষ্ট করে বলেন, “এ দুর্ঘটনাকে কেবল নির্ধারিত দায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না।”
কোন আইনে রায়
রায়ে ১৯২৯ সালের ওয়ারস কনভেনশন, ১৯৫৫ সালের সংশোধিত ওয়ারস কনভেনশন এবং ১৯৯৯ সালের মন্ট্রিল কনভেনশনের প্রাসঙ্গিক ধারার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। আদালত উল্লেখ করেন, ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ বা ক্ষতির সম্ভাবনা জেনেও বেপরোয়া আচরণ করলে দায়সীমা প্রযোজ্য হয় না। এ ক্ষেত্রে অবহেলা ছিল না—তা প্রমাণের দায় এয়ারলাইনের ওপর বর্তায়, যা ইউএস-বাংলা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে।

নেপালি আদালতের এখতিয়ার বৈধ
ইউএস-বাংলা দাবি করেছিল, ফ্লাইটটির চূড়ান্ত গন্তব্য ঢাকা হওয়ায় নেপালি আদালতের বিচারিক এখতিয়ার নেই। তবে আদালত এই যুক্তি খারিজ করে বলেন— নিহত নেপালি যাত্রীরা রাউন্ড-ট্রিপ টিকিটে বাংলাদেশে পড়াশোনা শেষে নেপালে ফিরছিলেন, ফলে নেপালই ছিল তাদের প্রকৃত গন্তব্য। এছাড়া দুর্ঘটনাটি কাঠমান্ডুতে সংঘটিত হওয়ায় জেলা আদালতের এখতিয়ার সম্পূর্ণ বৈধ বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
কত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী—বীমা কোম্পানি থেকে দেওয়া প্রতি পরিবার ২০ হাজার ডলার ছাড়াও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সকে মোট ২৭ লাখ ৪০ হাজার ডলার পরিশোধ করতে হবে। এই অর্থ দেওয়া হবে দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ১৭টি পরিবারকে।
এমবিবিএস শিক্ষার্থীসহ ক্ষতিপূরণের বিস্তারিত
- সাতজন এমবিবিএস শিক্ষার্থীর পরিবার পাবে প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার ডলার করে
- আরও ছয়জন শিক্ষার্থীর পরিবার পাবে প্রায় ১ লাখ ৭৯ হাজার ডলার করে
- নিউরোসার্জন বল কৃষ্ণ থাপার পরিবার পাবে ২ লাখ ৭৭ হাজার ডলার
- হিমালয়া এয়ারলাইন্স কর্মচারীর পরিবার পাবে ১ লাখ ৭ হাজার ডলার
- ৬৭ বছর বয়সী নার্সের পরিবার পাবে ৪৫ হাজার ডলার
- গুরুতর আহত জীবিত যাত্রী সামিরা ব্যাঞ্জনকর পাবেন ৪৪ হাজার ডলার
আদালতে দেওয়া সাক্ষ্যে জীবিত যাত্রীরা জানান—
- ক্যাপ্টেন ককপিটে ধূমপান করছিলেন
- অবতরণের ঘোষণা দেওয়া হয়নি
- নিরাপত্তা বিধি মানা হয়নি
ফ্লাইট ডেটা ও ককপিট ভয়েস রেকর্ডার বিশ্লেষণে কোনো কারিগরি ত্রুটি পাওয়া যায়নি। বরং পাইলটের ক্লান্তি, মানসিক চাপ ও পরিচালন পদ্ধতির গুরুতর লঙ্ঘনের প্রমাণ মেলে।

আইনি মাইলফলক রায়
কাঠমান্ডু পোস্টের মতে, এই রায় নেপালের এভিয়েশন ইতিহাসে একটি আইনি মাইলফলক। গত সাত দশকে দেশটিতে ৭০টির বেশি বিমান দুর্ঘটনা ঘটলেও এতদিন কোনো এয়ারলাইনকে এমন আর্থিক দায়ের মুখে পড়তে হয়নি। আদালতের ভাষায়, “প্রয়োজনীয় মান বজায় রেখে উড়োজাহাজ পরিচালনায় ব্যর্থ হওয়াই এই দুর্ঘটনার মূল কারণ।”
সাত বছরের দীর্ঘ আইনি লড়াই শেষে কাঠমান্ডু আদালত রায় দিয়েছেন—ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ইচ্ছাকৃত অসদাচরণ ও চরম অবহেলার কারণেই একটি সম্পূর্ণ উড্ডয়নযোগ্য উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ন্যায্য ও যথার্থ ক্ষতিপূরণ পাওয়ার অধিকারী।
এনএনবাংলা/

আরও পড়ুন
নির্বাচনকে ঘিরে পার্শ্ববর্তী দেশ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে : নাহিদ ইসলাম
দুর্নীতিগ্রস্ত না, মানবিক বাংলাদেশ দেখতে চাই: জামায়াত আমির
ভোটার হলেন কারাবন্দি ইনু–মেনন, অনিচ্ছুক মামুন