Saturday, January 31st, 2026, 3:38 pm

অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনে বড় হুমকি এআই’র অপব্যবহার

 

গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো জনগণের অবাধ, স্বাধীন ও সচেতন মত প্রকাশ। একটি নির্বাচন তখনই সুষ্ঠু ও অর্থবহ হয়, যখন ভোটার নির্ভয়ে ভোট দিতে পারেন এবং তাঁদের সিদ্ধান্ত সত্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে সেই সত্যের ভিত্তিই আজ বড় ধরনের হুমকির মুখে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি একদিকে মানুষের জীবনকে সহজ করছে, অন্যদিকে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থার জন্য তৈরি করছে নতুন বিপদ। বিশেষ করে এআই দিয়ে তৈরি ভুয়া ভিডিও, ছবি ও অডিও—যা ‘ডিপফেক’ নামে পরিচিত—নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এসব কনটেন্ট এতটাই বাস্তবসম্মত হয় যে সাধারণ মানুষের পক্ষে আসল-নকল আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

ডিপফেকের মাধ্যমে কোনো নেতার নামে মিথ্যা বক্তব্য প্রচার, ভুয়া দৃশ্য তৈরি কিংবা প্রার্থীর ভাবমূর্তি নষ্ট করা এখন খুব সহজ। এসব কনটেন্ট মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং সত্য যাচাইয়ের আগেই জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করে। ফলে প্রশ্ন ওঠে—যখন সত্যই অনিশ্চিত, তখন সুষ্ঠু নির্বাচন কীভাবে সম্ভব?

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যেই নির্বাচনে ডিপফেকের অপব্যবহার দেখা গেছে—যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ানসহ বহু দেশে এআইভিত্তিক অপতথ্য নির্বাচনী পরিবেশকে বিষাক্ত করেছে। অক্সফোর্ড ইন্টারনেট ইনস্টিটিউটের গবেষক সামান্থা ব্র্যাডশ যথার্থই বলেছেন, “নির্বাচনের লড়াই এখন ডিজিটাল যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে মিথ্যা সত্যের চেয়ে দ্রুত ছড়ায়।”

বাংলাদেশেও এ হুমকি ইতোমধ্যে বাস্তব রূপ নিয়েছে। ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন গাইবান্ধা-১ আসনের প্রার্থী আবদুল্লাহ নাহিদ নিগারের নামে ছড়ানো একটি ভুয়া ডিপফেক ভিডিও ভোটারদের বিভ্রান্ত করে। এই ঘটনা স্পষ্ট করে দেয়—ডিজিটাল সাক্ষরতা কম এমন দেশে ডিপফেক কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।

এ ছাড়া ‘চিপফেক’ নামের অপেক্ষাকৃত সহজ প্রযুক্তিতেও পুরোনো ছবি-ভিডিও এডিট করে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। ভিডিওর অংশবিশেষ কেটে ভিন্ন অর্থ তৈরি, মিথ্যা ক্যাপশন জুড়ে দেওয়া—এসব এখন রাজনৈতিক অপপ্রচারের সাধারণ কৌশল।

বাংলাদেশে প্রায় ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে পরিকল্পিতভাবে ভুয়া ভিডিও ছড়ালে তার প্রভাব হতে পারে ভয়াবহ। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক নেতা ও গণমাধ্যমও যাচাই না করেই এসব অপতথ্য বিশ্বাস করছে, যা সংকটকে আরও গভীর করছে।

বিশ্লেষকেরা বলছেন, অপতথ্যের পেছনে একদিকে আদর্শিক গোষ্ঠী, অন্যদিকে অর্থের বিনিময়ে কাজ করা বটবাহিনী সক্রিয়। ভুয়া অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সমন্বিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়ানো হলেও এর নেপথ্যের কারিগরদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

আইন অনুযায়ী এআই ব্যবহার করে ভোটারকে বিভ্রান্ত করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও বাস্তবে কার্যকর পদক্ষেপ খুবই সীমিত। ফলে ভুয়া ভিডিও নির্বিঘ্নে ছড়িয়ে পড়ছে এবং নির্বাচনী বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট হচ্ছে।

এই সংকট মোকাবিলায় শুধু আইন যথেষ্ট নয়—দ্রুত ও কার্যকর প্রয়োগ জরুরি। নির্বাচন কমিশনের বিশেষায়িত টাস্কফোর্স গঠন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং সন্দেহজনক কনটেন্ট দ্রুত অপসারণের ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যাতে যাচাই ছাড়া কেউ কনটেন্ট শেয়ার না করেন।

এআই প্রযুক্তি নিজে শত্রু নয়—শত্রু এর অপব্যবহার। কিন্তু নির্বাচনকালীন সময়ে এই অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতের নির্বাচন আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। তাই অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে এআই-নির্ভর অপতথ্যের বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া অপরিহার্য।

এনএনবাংলা/পিএইচ