Saturday, January 31st, 2026, 7:14 pm

হাসিনার দপ্তর ও বাসার আড়াই কোটি টাকার খাবারের বিল বাকি, দায় নিতে রাজি না অন্তর্বর্তীকালীন সরকার

 

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনার সরকারি কার্যালয় ও বাসভবন, গণভবনে খাবার সরবরাহের বিপুল বকেয়া রয়েছে হোটেল অবকাশের কাছে। মোট পাওনা প্রায় আড়াই কোটি টাকা। বর্তমানে অন্তর্বর্তী সরকারও এই বকেয়া পরিশোধের দায়িত্ব নিচ্ছে না, ফলে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বাপক) ও হোটেল অবকাশের মধ্যে বকেয়া আদায়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

জানা গেছে, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনে চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত খাবার সরবরাহ করত হোটেল অবকাশ। এ বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি ছিল। চুক্তির আওতায় খাবার সরবরাহ করা হলেও বিল আংশিক পরিশোধ হতো, কিছু বকেয়া থেকে যেত। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলে ওই বকেয়া বিল আর পাওয়া যায়নি। হোটেল অবকাশ বেশ কয়েকবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে চিঠি দিলেও গত দেড় বছরে কোনো অর্থ ফেরত পাননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পর্যটন করপোরেশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “বকেয়া আদায়ে একাধিকবার প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান সরকার বিগত সরকারের বকেয়া পরিশোধে অপারগতা দেখাচ্ছে।”

সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাসভবনেও হোটেল অবকাশ চাহিদা অনুযায়ী খাবার সরবরাহ করছে। এ খাতে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বকেয়া রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের প্রশাসন বিভাগের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল ওয়াদুদ চৌধুরী বলেন, “পর্যটন করপোরেশন বা হোটেল অবকাশের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়। আমরা সবসময় এ ধরনের বিল পরিশোধ করি। হয়ত কিছু রানিং (চলমান) বিল বাকি আছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া।”

পর্যটন করপোরেশনের চিঠিতে বলা হয়েছে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কালে খাবার সরবরাহ বাবদ মোট অপরিশোধিত পাওনা প্রায় ২ কোটি ৮৯ লাখ ২০ হাজার টাকা। এর মধ্যে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের বিল ছিল প্রায় ২ কোটি ৫৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাসভবনে যমুনায় প্রায় ৩৪ লাখ ৭৩ হাজার টাকার খাবার ও সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। এসব বিল দাখিল করা হলেও অর্থ পরিশোধ হয়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, বকেয়া আদায় না হওয়ায় তহবিল সংকটে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমে সমস্যা হচ্ছে। তারল্য সংকটে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন–ভাতা পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে। কাঁচামাল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছেও বকেয়া রয়েছে, ফলে তারা মালামাল দিতে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। এর ফলে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাসভবনে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহে সমস্যা দেখা দিচ্ছে।

বাপক চেয়ারম্যান সায়েমা শাহীন সুলতানা বলেন, “বকেয়া আছে, এটি সত্য। তবে বকেয়া আদায় হোটেল অবকাশের ব্যবস্থাপকের দায়িত্ব। কিছু বিল প্রক্রিয়াধীন আছে। বকেয়া আদায়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতেও দেওয়া হবে।”

উল্লেখযোগ্য, বকেয়া থাকার পরও ২০২৫ সালে প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের সঙ্গে হোটেল অবকাশ নতুন চুক্তি করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, আগস্ট থেকে এক বছরের জন্য প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় ও বাসভবন যমুনায় আপ্যায়ন ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে খাবার সরবরাহ করছে। চুক্তিপত্র অনুযায়ী, হোটেল অবকাশ ৪৬০ ধরনের খাবার ও সামগ্রী সরবরাহ করে। এর মধ্যে রয়েছে ড্রাইকেক, বেকারি বিস্কুট, কমলা, মান্দারিন কমলা, জামরুল, লটকন, আমড়া, কাঁচা ছানা, চমচম, রসমালাই, দই, লাড্ডু, রসগোল্লা, বাকলাভা, বিভিন্ন মসলা, ঘি ও ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য।

এক কর্মকর্তা জানান, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সময় থেকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বাসভবনে খাবার সরবরাহ করে আসছে হোটেল অবকাশ। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সময় রাজনৈতিক সভা ও সমাবেশ বেশি হওয়ায় প্রতিদিন অনেক লোকের খাবারের ব্যবস্থা করতে হতো, তাই বকেয়ার পরিমাণও বেশি ছিল।

হোটেল অবকাশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিবছরই চুক্তি নবায়ন হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সময় ১৭৩ ধরনের খাবার সরবরাহ করা হতো, বর্তমানে প্রধান উপদেষ্টার জন্য ৪৬০টি আইটেম নির্ধারিত মূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। এসব সরবরাহে নিজেদের তহবিলের অর্থ ব্যয় করতে হয়। তিন মাস পরপর বিল জমা দেওয়া হয়, এরপর ধাপে ধাপে বকেয়া পরিশোধ করা হয়।

এনএনবাংলা/পিএইচ