জুলাই গণঅভ্যুত্থানে গণহত্যার অভিযোগে কার্যক্রমনিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না আওয়ামী লীগ। দলের প্রতিষ্ঠার পর থেকে এটি তৃতীয়বার, যখন আওয়ামী লীগকে ছাড়াই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে আগের দুইবার দলটি নিজ থেকেই নির্বাচন বয়কট করেছিল।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার কেএম দাস লেনের রোজ গার্ডেনে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ। প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন শামসুল হক। পরবর্তীতে ‘মুসলিম’ শব্দ বাদ দিয়ে দলটির নাম রাখা হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। প্রতিষ্ঠার পর এই প্রথমবার দলটি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলো। এর আগে ১৯৮৮ সালে এরশাদ সরকারের অধীনে এবং ১৯৯৬ সালে খালেদা জিয়ার সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচন আওয়ামী লীগ বয়কট করেছিল।
আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইতিহাস
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচন প্রতিষ্ঠার পর আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে অংশ নেয়। ৮ থেকে ১২ মার্চ অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে ২২৩টি আসনে জয়ী হয়। এর মধ্যে মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী মুসলিম লীগ পায় ১৪৩টি আসন। মোট ৩০৯ আসনের মধ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য ৭২টি আসন সংরক্ষিত ছিল।
১৯৬৫ সালের পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
১৯৬৫ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে সম্মিলিত বিরোধী দলের প্রার্থী ফাতেমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়েছিল আওয়ামী লীগ। তবে ওই নির্বাচনে ফাতেমা জিন্নাহ পরাজিত হন।
১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন
১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত পাকিস্তানের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পূর্ব পাকিস্তানের ১৬২টি আসনের মধ্যে দলটি ১৬০টিতে জয়লাভ করে। একইসঙ্গে প্রাদেশিক নির্বাচনেও পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বলির ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়ী হয় আওয়ামী লীগ।
স্বাধীন বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ছয়বার, বিএনপি চারবার এবং জাতীয় পার্টি দুইবার সরকার গঠন করেছে।
প্রথম সংসদ নির্বাচন – ১৯৭৩
৭ মার্চ অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৩টিতে জয়লাভ করে।
দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন – ১৯৭৯
১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
তৃতীয় সংসদ নির্বাচন – ১৯৮৬
৭ মে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে এরশাদের জাতীয় পার্টি জয়ী হয়। আওয়ামী লীগ অংশ নিলেও বিএনপি নির্বাচন বর্জন করে।
চতুর্থ সংসদ নির্বাচন – ১৯৮৮
৩ মার্চ অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ অধিকাংশ দল বর্জন করে। এটি ছিল আওয়ামী লীগের প্রথম নির্বাচন বর্জন।
পঞ্চম সংসদ নির্বাচন – ১৯৯১
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০ আসনে জয়ী হয়।
ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচন – ১৯৯৬ (ফেব্রুয়ারি)
বিএনপি সরকারের অধীনে হওয়া এই নির্বাচন আওয়ামী লীগসহ বিরোধী দলগুলো বয়কট করে। এটি ছিল আওয়ামী লীগের দ্বিতীয়বার নির্বাচন বর্জন।
সপ্তম সংসদ নির্বাচন – ১৯৯৬ (জুন)
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে।
অষ্টম সংসদ নির্বাচন – ২০০১
এই নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে।
নবম সংসদ নির্বাচন – ২০০৮
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০ আসনে জয়ী হয়।
দশম সংসদ নির্বাচন – ২০১৪
বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধী দলগুলোর বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৪টি আসন পায়। এটি “বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন” নামে পরিচিত।
একাদশ সংসদ নির্বাচন – ২০১৮
এই নির্বাচন ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং ‘রাতের ভোট’ নামে পরিচিতি পায়। আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৫৮ আসনে জয়ী হয়।
দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন – ২০২৪
বিএনপি-জামায়াতের বর্জনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচন ‘ডামি নির্বাচন’ নামে পরিচিত হয়। এতে আওয়ামী লীগ ২২২টি আসনে জয়লাভ করে। তবে এই সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র সাত মাস।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রক্তাক্ত গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করেন। এরপর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এই সরকারের অধীনেই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যেখানে আওয়ামী লীগ প্রথমবারের মতো অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে না।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
নির্বাচনের দিন চলবে অতিরিক্ত মেট্রোরেল, তবে বন্ধ থাকবে কয়েকটি স্টেশন
ভারতের ম্যাচ বয়কটের জন্য পাকিস্তানকে ধন্যবাদ জানালেন আসিফ নজরুল
নির্বাচন নির্বিঘ্ন করতে এক লাখ সেনাসদস্য মোতায়েন করা হয়েছে : সেনাসদর