আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অন্তত ৪৫ জন ঋণগ্রস্ত প্রার্থী বিদ্যমান আইনের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ আশানুরূপ না হওয়ায় এবং রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে নির্বাচন প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলেও মনে করছে সংস্থাটি।
রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর ধানমন্ডির মাইডাস সেন্টারে আয়োজিত ‘প্রাক-নির্বাচন এবং গণভোট পরিস্থিতি: টিআইবি’র পর্যবেক্ষণ’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। অনুষ্ঠানে প্রাক-নির্বাচন পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির গবেষক মো. মাহফুজুল হক। এ সময় টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
টিআইবি জানায়, প্রাথমিকভাবে অনেক প্রার্থী ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হলেও আইনগত অস্পষ্টতা ও সময়সীমা বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগিয়ে অন্তত ৪৫ জন প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা বৈধ করতে সক্ষম হয়েছেন। সংস্থাটির মতে, ঋণখেলাপিদের ক্ষেত্রে আইনের দুর্বল প্রয়োগ এবং নির্বাচন কমিশনের বিতর্কিত ব্যাখ্যা আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুবিধা দিচ্ছে, যা নির্বাচনের নৈতিকতা ও সমান প্রতিযোগিতার পরিবেশকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রার্থীদের জমা দেওয়া হলফনামায় আয়-ব্যয়, ঋণ, দায়, বিদেশে সম্পদ ও দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নানা অসঙ্গতি থাকলেও সেগুলোর যথাযথ যাচাই-বাছাই হয়নি। টিআইবি ও গণমাধ্যমে এসব বিষয়ে তথ্য প্রকাশের পরও অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না—তা নিয়ে সংশয় রয়ে গেছে। সংস্থাটি মনে করে, ঋণগ্রস্ত প্রার্থীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ শুধু আইনি সমস্যা নয়, বরং নৈতিক সংকটও সৃষ্টি করছে।
একই প্রতিবেদনে নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের হতাশাজনক চিত্র তুলে ধরে টিআইবি জানায়, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী ৩০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটিতেও কোনো নারী প্রার্থী নেই। জুলাই সনদে অন্তত ৫ শতাংশ নারী প্রার্থী মনোনয়নের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে নারী প্রার্থীর হার মাত্র ৪.০৫ শতাংশ।
বড় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও নারী মনোনয়নের হার অত্যন্ত কম। বিএনপিতে নারী প্রার্থীর হার ২.৮ শতাংশ, জাতীয় পার্টিতে ৩.১ শতাংশ এবং এনসিপিতে ৬.৩ শতাংশ। বিশেষ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৩০টি দলের কোনো নারী প্রার্থী না থাকাকে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে গভীর সংকটের প্রতিফলন বলে মনে করছে টিআইবি।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ক্ষেত্রে নারী অংশগ্রহণ তুলনামূলক কিছুটা বেশি হলেও হার মাত্র ৭.৮৭ শতাংশ। টিআইবির মতে, ‘যোগ্য নারী প্রার্থী পাওয়া যায় না’—এই যুক্তির বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং দলগুলোর অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার রাজনীতি, জোটগত সমীকরণ এবং পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই যোগ্য নারী প্রার্থীদের উপেক্ষা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নারী প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণার সময় নানামুখী প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। তাদের বিরুদ্ধে অশালীন ও নারীবিদ্বেষী মন্তব্য, পোস্টার ছেঁড়া, প্রচারণায় বাধা দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হয়রানির ঘটনা ঘটছে। কিছু ক্ষেত্রে ধর্মান্ধ ও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ তাদের নির্বাচনী কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
এছাড়া নাগরিক তথ্য সুরক্ষার বিষয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে টিআইবি। নির্বাচন কমিশনের অব্যবস্থাপনার কারণে ওয়েবসাইটে নিবন্ধনের সময় প্রায় ১৪ হাজার গণমাধ্যমকর্মীর ব্যক্তিগত তথ্য সাময়িকভাবে ফাঁস হওয়ার ঘটনা ঘটেছে, যা সাংবাদিকদের পাশাপাশি সাধারণ নাগরিকদের তথ্য নিরাপত্তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় টিআইবি মনে করে, ঋণখেলাপি প্রার্থীদের বিষয়ে কঠোর অবস্থান গ্রহণ, নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং নাগরিক তথ্য সুরক্ষায় নির্বাচন কমিশনের আরও সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা পালন জরুরি। অন্যথায় অবাধ, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন আয়োজন বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি।
এনএনবাংলা/পিএইচ

আরও পড়ুন
ভোট উপলক্ষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন সীমিত রাখার নির্দেশ
নির্বাচনে রিকুইজিশন করা গাড়ির দৈনিক খোরাকি ৪,৯০০ টাকা
হাদি হত্যার সুষ্ঠু তদন্তে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাইল সরকার