Sunday, February 8th, 2026, 8:50 pm

বাংলাদেশের নির্বাচন বদলে দিতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির সমীকরণ: এএফপি

 

বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া চলতি সপ্তাহের জাতীয় সংসদ নির্বাচন দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। চীন এই অঞ্চলে নিজেদের প্রভাব আরও বাড়াতে চাইছে, একই সময়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ায় নতুন কৌশলগত বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।

শেখ হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন হবে ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্রনেতৃত্বাধীন আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার স্বৈরশাসনের অবসানের পর দেশের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত আশ্রয় দিয়ে যাওয়ায় অন্তর্বর্তী সরকার ও নয়াদিল্লির মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।

ড. ইউনূসের নেতৃত্বে চীনমুখী কূটনৈতিক ঝোঁক

নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই চীন ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে এগিয়ে যাচ্ছে। ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, এটি ভারতের সঙ্গে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সমীকরণে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

বাংলাদেশ এখন চীনের বঙ্গোপসাগর কৌশলের কেন্দ্রে

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস–এর জ্যেষ্ঠ ফেলো জোশুয়া কারলান্টজিক বলেন, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ—উভয় সরকারই স্পষ্টভাবে চীনের দিকে ঝুঁকছে। তার মতে, বাংলাদেশ এখন চীনের বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক কৌশলগত ভাবনায় একটি কেন্দ্রীয় অবস্থানে রয়েছে।

চীনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি ও ড্রোন কারখানা

ড. ইউনূস অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফর করেন চীনে, যা কৌশলগত পরিবর্তনের স্পষ্ট বার্তা। চলতি বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়, যার আওতায় ভারতের উত্তর সীমান্তের কাছাকাছি একটি এলাকায় ড্রোন কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক গভীর হওয়া এখন অপরিবর্তনীয়

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক ড. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, বাংলাদেশ–চীন সম্পর্ক আরও গভীর হবে—এটি এখন প্রায় নিশ্চিত।

ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্কে উত্তেজনা ও সংখ্যালঘু ইস্যু

শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বাড়ছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ জানায়। পুলিশের তথ্যমতে, ২০২৫ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় ৭০ জন সংখ্যালঘু নিহত হয়েছেন। তবে ঢাকা বলছে, ভারত এসব ঘটনা অতিরঞ্জিত করছে।

বিএনপি এগিয়ে, তারেক রহমান সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনে বিএনপি এগিয়ে রয়েছে। দলটি জিতলে তারেক রহমান সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। জানুয়ারিতে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে ঢাকায় আসেন, এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তারেক রহমানকে সমবেদনা জানান।

ক্রিকেট ইস্যুতেও কূটনৈতিক উত্তাপ

সম্প্রতি এক বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ‘হিন্দুত্ববাদী প্রতিবাদের’ কারণে আইপিএল দল থেকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় সম্পর্ক আরও চাপে পড়ে। এর প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশ ভারতের পরিবর্তে অন্য দেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে চাওয়ার ইঙ্গিত দেয়।

পাকিস্তানের সঙ্গেও সম্পর্ক পুনরুদ্ধার

বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যেও সম্পর্ক উষ্ণ হচ্ছে। জানুয়ারিতে এক দশকের বেশি সময় পর পুনরায় সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করবে, তবে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট না করেই।

বাস্তববাদী সম্পর্কেই ফিরবে ঢাকা–দিল্লি?

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ–এর বিশ্লেষক দোন্থি বলেন, উভয় দেশই জানে সম্পর্ক খারাপ রাখার মূল্য কতটা বেশি। অবসরপ্রাপ্ত কূটনীতিক হুমায়ুন কবীর মনে করেন, নির্বাচনের পর একটি নির্বাচিত সরকার এলে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক আবার স্থিতিশীল হতে পারে।

‘চীন না ভারত’—এটা কোনো একমাত্রিক সমীকরণ নয়

ভারতের সাবেক কূটনীতিক দিলীপ সিনহা বলেন, চীন দ্রুত অবকাঠামো দেয়, ভারত তা পারে না। তবে বিদ্যুৎ ও গার্মেন্টস খাতের জন্য ভারতের সরবরাহ বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য। বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা মানেই ভারতের সঙ্গে শত্রুতা নয়।

হুমায়ুন কবীরের ভাষায়, “এটা কোনো ‘একটা না হলে আরেকটা’ পরিস্থিতি নয়। দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক ভালো রাখা সম্ভব।”

এনএনবাংলা/