February 12, 2026
Thursday, February 12th, 2026, 1:33 am

৩৬ বছর পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পেতে যাচ্ছে বাংলাদেশ

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে যাচ্ছে। ১৯৯১ সাল থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত—মাঝখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রায় দুই বছর বাদ দিলে—প্রায় সাড়ে তিন দশক দেশের শাসনক্ষমতা আবর্তিত হয়েছে দুই নারী নেত্রীকে কেন্দ্র করে।

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান, শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই ঘটনার পর ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক রাজনৈতিক অধ্যায়।

নারী নেতৃত্বের অধ্যায়

১৯৯১ সালে স্বৈরশাসক এইচ এম এরশাদের পতনের পর বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপর শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকে কেন্দ্র করেই দেশের রাজনীতি আবর্তিত হয়েছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেন। আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।

অন্যদিকে, গত ৩০ ডিসেম্বর চিকিৎসাধীন অবস্থায় খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘটে। এর মধ্য দিয়ে কার্যত অবসান ঘটে বাংলাদেশের আলোচিত ‘দুই নেত্রী’র যুগের।

সম্ভাব্য পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন

এবারের নির্বাচনে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর নেতৃত্বে কোনো নারী নেই। বিএনপির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন তারেক রহমান। বিএনপি জয়ী হলে তিনিই সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী—এমনটাই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।

অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটও নির্বাচনী মাঠে সক্রিয়। এই জোট থেকেও পুরুষ নেতৃত্ব সরকারপ্রধান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।

১৯৮৯-১৯৯০ সালে কাজী জাফর আহমদ ছিলেন বাংলাদেশের সর্বশেষ পুরুষ প্রধানমন্ত্রী। ১৯৯১ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে শুরু হয় নারী নেতৃত্বের দীর্ঘ অধ্যায়। সেই হিসেবে প্রায় ৩৬ বছর পর জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে আবারও একজন পুরুষ প্রধানমন্ত্রী শপথ নিতে যাচ্ছেন—যা সংসদীয় ইতিহাসে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন।

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা

  • তাজউদ্দীন আহমদ (১৯৭১-১৯৭২)
  • শেখ মুজিবুর রহমান (১৯৭২-১৯৭৫)
  • মুহাম্মদ মনসুর আলী (১৯৭৫)
  • শাহ আজিজুর রহমান (১৯৭৯-১৯৮২)
  • আতাউর রহমান খান (১৯৮৪-১৯৮৫)
  • মিজানুর রহমান চৌধুরী (১৯৮৬-১৯৮৮)
  • মওদুদ আহমদ (১৯৮৮-১৯৮৯)
  • কাজী জাফর আহমদ (১৯৮৯-১৯৯০)
  • খালেদা জিয়া (১৯৯১-১৯৯৬, ১৯৯৬, ২০০১-২০০৬)
  • শেখ হাসিনা (১৯৯৬-২০০১, ২০০৯-২০২৪)

নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে আলোচনা

২০১৪ সালের নির্বাচনকে বলা হয় ‘বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার’, ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘রাতের ভোটের’ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনকে ‘ডামি ভোটের’ নির্বাচন। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেবল ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং গণতন্ত্রের গ্রহণযোগ্যতা পুনর্গঠনের এক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক কাজী মোহাম্মাদ মাহবুবুর রহমান বলেন, “গত তিন দশকে নারী নেতৃত্ব বাংলাদেশের রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার অনুপস্থিতি এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যু—এই দুই বাস্তবতায় ক্ষমতার কেন্দ্রে পুরুষ নেতৃত্বের প্রত্যাবর্তন এখন সময়ের ব্যাপার।”

নতুন বাস্তবতার সূচনা

স্বাধীনতার পর থেকে বহু রাজনৈতিক উত্থান-পতনের সাক্ষী বাংলাদেশ। তবে ‘দুই নেত্রী’র যুগ’ ছিল দীর্ঘতম ও প্রভাবশালী অধ্যায়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি টেনে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা করতে যাচ্ছে।

এনএনবাংলা/