February 12, 2026
Thursday, February 12th, 2026, 2:40 pm

হাসিনার পতনের পর প্রথম জাতীয় নির্বাচন নিয়ে যা বলছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

গুলশান মানারাত স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে ভোট প্রদানের পর আনন্দে সেলফি তুলছেন কয়েকজন/ ছবি: মঈন আহমেদ

 

২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় দেড় বছর পর আজ অনুষ্ঠিত হচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন। একই সঙ্গে রাষ্ট্র সংস্কারসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাবনা নিয়ে হচ্ছে গণভোট। এই নির্বাচনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে ব্যাপক আগ্রহ ও বিশ্লেষণ।

আল জাজিরা: গণতন্ত্রে ফেরার বড় পরীক্ষা

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা তাদের লাইভ আপডেটে জানিয়েছে, প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে যাচ্ছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে দীর্ঘদিনের স্বৈরশাসক শেখ হাসিনার পতনের পর এটি গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তনের একটি বড় পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনে সরাসরি লড়াই হচ্ছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের মধ্যে। এই জোটে রয়েছে শিক্ষার্থী আন্দোলন থেকে উঠে আসা ন্যাশনাল সিটিজেনস পার্টি (এনসিপি)। দুর্নীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন—এই ইস্যুগুলোই ভোটারদের সিদ্ধান্তে বড় ভূমিকা রাখছে।

বিবিসি: দুই প্রধান নেত্রী ছাড়া প্রথম নির্বাচন

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, সকাল সাড়ে ৭টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছে। তারা উল্লেখ করেছে, কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথমবার দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব—শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—কেউ নির্বাচনী মাঠে নেই।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় ইসলামপন্থি দলগুলো বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাশাপাশি ‘জুলাই সনদ’ নামে একটি সাংবিধানিক সংস্কারপ্যাকেজ নিয়েও গণভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। প্রথমবারের মতো প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে।

রয়টার্স: জেন-জি ভোটারদের অগ্রাধিকার—চাকরি ও স্বাধীনতা

ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, বাংলাদেশের জেন-জি ভোটারদের কাছে তিনটি বিষয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ—
চাকরি, সুশাসন ও ভয়ভীতি ছাড়া কথা বলার স্বাধীনতা।

রয়টার্স এই নির্বাচনকে ২০০৯ সালের পর প্রথম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে উল্লেখ করেছে। তবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত থাকায় তারা অংশ নিতে পারেনি।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কয়েক মাসের অস্থিরতায় তৈরি পোশাক খাতসহ বড় শিল্পখাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জন্য স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এএফপি: ব্যাপক ভোটার অংশগ্রহণের আশা

ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ১৫ বছরের শাসনের অবসানের পর অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ব্যাপক ভোটার অংশগ্রহণের আশা করছে।

নিউইয়র্ক টাইমস: তরুণ ভোটারদের নতুন প্রত্যাশা

যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস বলেছে, ২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণ ভোটাররা দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন দিকনির্দেশনা প্রত্যাশা করছেন।

ডয়চে ভেলে: ইসলামপন্থিদের প্রভাব বৃদ্ধি

জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, স্বাধীনতার পর এই প্রথম ইসলামপন্থি শক্তিগুলো সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী উপস্থিতি দেখাতে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না থাকায় রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন এসেছে।

দ্য হিন্দু: ৫০% ভোটকেন্দ্র ‘ঝুঁকিপূর্ণ’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানিয়েছে, অর্ধেকের বেশি ভোটকেন্দ্রকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রের ৯০ শতাংশে সিসিটিভি স্থাপন করা হয়েছে এবং পুলিশ সদস্যরা বডি ক্যামেরা ব্যবহার করছেন।

দ্য ডন: সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের বিস্তার

পাকিস্তানের দ্য ডন সতর্ক করেছে, নির্বাচনকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য, বিকৃত ছবি ও এআই-নির্মিত ভিজ্যুয়াল ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অপপ্রচারের লক্ষ্য মূলত দোদুল্যমান ভোটারদের প্রভাবিত করা। ইউল্যাবের অধ্যাপক ড. দীন এম সুমন রহমান বলেন, ভুল তথ্য প্রচারের উদ্দেশ্য হলো ভোটারের পছন্দকে প্রভাবিত করা এবং অনিশ্চিত ভোটারদের সিদ্ধান্ত বদলে দেওয়া।

হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় নির্বাচন শুধু দেশের জন্যই নয়, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। রাজনৈতিক পুনর্গঠন, সাংবিধানিক সংস্কার, ইসলামপন্থি শক্তির উত্থান এবং তরুণ ভোটারদের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে এই নির্বাচন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

এনএনবাংলা/