ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দীর্ঘ ২০ বছর পর আবারও সরকার গঠনের পথে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। ঘোষিত ২৯৭টি আসনের ফলাফলে দলটি এককভাবে পেয়েছে ২০৯টি আসন, আর তাদের মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি। ফলে একক দল হিসেবেই সরকার গঠনের সাংবিধানিক শর্ত পূরণ করেছে বিএনপি।
বাংলাদেশে সরকার গঠনের জন্য ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ন্যূনতম ১৫১টি আসনে জয়লাভ প্রয়োজন। সে হিসেবে বিএনপির প্রাপ্ত আসন সংখ্যা তাদের স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার অবস্থানে নিয়ে গেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসনে জয় পেয়েছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি অর্জন করেছে ৬টি আসন এবং তাদের মিত্ররা পেয়েছে আরও ৩টি। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ পেয়েছে ১টি আসন। এছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন ৭টি আসনে।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা-১৭ ও বগুড়া-৬—দুটি আসনেই বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। এবারই তিনি প্রথমবারের মতো জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন। অন্যদিকে, ঢাকা-১৫ আসনে জয়লাভ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বিএনপি আগেই ঘোষণা দিয়েছিল, দল সরকার গঠন করলে তারেক রহমানই হবেন দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী।
সর্বশেষ ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল বিএনপি। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া রাষ্ট্রপতির কাছে ইস্তফা প্রদান করলে সেই মেয়াদের সমাপ্তি ঘটে।
দলটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে দলটি জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছে। দীর্ঘ নয় বছর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে ১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন। এছাড়া ১৯৯৬ সালেও স্বল্প সময়ের জন্য সরকার গঠন করেছিল বিএনপি।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে গত বছরের ২৫ নভেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান এবং ২৭ নভেম্বর ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হন। আশির দশকে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় থেকেই তিনি সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৮৮ সালে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে তার আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়। ১৯৯৩ সালে বগুড়ায় গোপন ব্যালটের মাধ্যমে নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া চালু করে তৃণমূল রাজনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
২০০২ সালে তিনি দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
উল্লেখ্য, গত ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়া মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ৯ জানুয়ারি দলের স্থায়ী কমিটি তারেক রহমানকে চেয়ারম্যান হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী, এবারই প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দল হতে যাচ্ছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। অতীতে তারা বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হিসেবে সরকার ও বিরোধী—উভয় ভূমিকায় ছিল; তবে এবার স্বতন্ত্রভাবে প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই ফলাফল দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণার পর সরকার গঠন ও বিরোধী দলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

আরও পড়ুন
ঢাকার ২০টি আসনে বিজয়ী হলেন যাঁরা, পেলেন কত ভোট
নির্বাচনে মেঘনা আলম ৬০৮— আম জনতার তারেক ১০৪৪ ভোট, জামানত বাজেয়াপ্ত
১৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সরকার গঠন, সব দলকে নিয়ে সংসদে যাবে বিএনপি: মির্জা ফখরুল