জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোটে বিপুল ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের শাসনব্যবস্থায় আসছে বিস্তৃত সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন। জাতীয় সংসদ রূপ নিচ্ছে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কাঠামোয়; পাশাপাশি বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নিয়োগের বিধান যুক্ত হচ্ছে। নারীদের প্রতিনিধিত্ব ধাপে ধাপে বাড়িয়ে সংরক্ষিত আসন ৫০ থেকে ১০০-তে উন্নীত করার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন বাধ্যতামূলক থাকবে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত কোনো চুক্তির জন্য সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে।
নির্বাচিত সংসদ শপথের পর প্রথম ১৮০ দিন সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। এরপর তারা নিয়মিত আইনপ্রণেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন বা নবগঠনের বিধান যুক্ত হচ্ছে। সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বিশেষজ্ঞ কমিটিও দায়িত্ব পালন করবে।
সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনের মাধ্যমে অর্থবিল ও সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব ছাড়া অন্য সব বিলে সংসদ-সদস্যরা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দিতে পারবেন। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ নির্দিষ্ট করে একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাবেন। জরুরি অবস্থা জারির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে মন্ত্রিসভার অনুমোদন লাগবে এবং সেই বৈঠকে বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। জরুরি অবস্থাতেও সংবিধানের ৩৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মৌলিক অধিকার খর্ব করা যাবে না।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে ভোটে। অভিশংসনের ক্ষেত্রেও উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন হবে। রাষ্ট্রপতির ক্ষমা প্রদানের ক্ষমতা সীমিত করে বলা হয়েছে—ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা পরিবারের সম্মতি ছাড়া ক্ষমা দেওয়া যাবে না।
সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একাধিক কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের জন্য পাঁচ সদস্যের কমিটি এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের জন্য সাত সদস্যের কমিটি থাকবে, যেখানে বিচার বিভাগীয় প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ আপিল বিভাগ থেকে করতে হবে এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সাংবিধানিকভাবে সুসংহত করা হবে। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশন দায়িত্ব পালন করবে।
সংবিধানের মূলনীতি পুনর্নির্ধারণ করে সাম্য, মানবিক মর্যাদা, সামাজিক ন্যায়বিচার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সম্প্রীতিকে ভিত্তি করা হয়েছে। সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়টি যুক্ত হয়েছে। নিরবচ্ছিন্ন ইন্টারনেট ও ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা মৌলিক অধিকারের অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। নাগরিক পরিচয় ‘বাঙালি’র পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ করা হয়েছে এবং বাংলা রাষ্ট্রভাষা থাকলেও অন্যান্য মাতৃভাষার স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
সংবিধানের প্রস্তাবনা ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুচ্ছেদ পরিবর্তনে গণভোট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করে মেয়াদ ৯০ দিন নির্ধারণ করা হয়েছে, প্রয়োজনে সর্বোচ্চ ৩০ দিন বাড়ানোর সুযোগ থাকবে। প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগে পাঁচ সদস্যের বাছাই কমিটি গঠনের বিস্তারিত প্রক্রিয়াও নির্ধারিত হয়েছে।
জুলাই সনদের কিছু ধারায় বিএনপি নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, বিশেষ করে সরকার প্রধান ও দলীয় প্রধানের পদ পৃথকীকরণ এবং কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগসংক্রান্ত বিধানে। তবে এসব বিষয়ে গণভোটে জনগণকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়।
মোট ১২ কোটি ৭৭ লাখ ভোটারের মধ্যে গণভোটে অংশ নেন ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ। ‘হ্যাঁ’ ভোট পেয়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ৭৪ হাজার ৪২৯ এবং ‘না’ ভোট ২ কোটি ২৫ লাখ ৬৫ হাজার ৬২৭। ফলে বড় ব্যবধানে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হয়েছে। দেশের ইতিহাসে এটি চতুর্থ গণভোট। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘হ্যাঁ’ জয়ী না হলে পুরো জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি অনিশ্চিত হয়ে পড়ত এবং অন্তর্বর্তী সরকার বড় চ্যালেঞ্জে পড়ত।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু বাংলাদেশের
মাদারীপুরে হত্যাকাণ্ডের জেরে হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘাটিয়ে ৪০ বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট
জ্বালানি সংকটে কমেছে দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ, ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কা