রমজান মাস সংযম, আত্মশুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক উন্নয়নের সময়। তবে দীর্ঘক্ষণ উপবাসের পর ইফতারের মুহূর্তে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা অনেকের মধ্যেই দেখা যায়। এর ফলেই রমজান শেষে ওজন বৃদ্ধি, বদহজম, গ্যাস্ট্রিক ও ক্লান্তির মতো সমস্যা দেখা দেয়।
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আফসানা হক নয়ন জানান, সংযমই সুস্থতার মূল চাবিকাঠি। সঠিক খাদ্য নির্বাচন, পরিমিতি ও খাওয়ার নিয়ম মেনে চললে রমজানেও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং হজমশক্তি ভালো রাখা সম্ভব।
দীর্ঘ উপবাসের পর অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কেন বাড়ে
- সারাদিন রোজা রাখার ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা কমে যায় এবং ক্ষুধার হরমোন ‘ঘ্রেলিন’য়ের নিঃসরণ বেড়ে যায়। ফলে শরীর দ্রুত শক্তি ও পুষ্টির সন্ধান করে এবং উচ্চ-চিনি ও উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে।
- দীর্ঘ উপবাসের পর খাবার গ্রহণ করলে পাকস্থলী থেকে মস্তিষ্কে ‘পূর্ণতা’র সংকেত পৌঁছাতে প্রায় ২০ মিনিট সময় লাগে। ফলে তৃপ্তির অনুভূতি আসার আগেই অতিরিক্ত খাবার গ্রহণ হয়ে যায়।
- পারিবারিক আড্ডা, ঐতিহ্য ও আবেগও এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করে তোলে।
ইফতার শুরু করুন ধীরে ও সঠিকভাবে
ইফতারের প্রথম ধাপই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
- হঠাৎ ভারী খাবার গ্রহণ না করে ২-৩টি খেজুর ও পানি দিয়ে শুরু করুন।
- খেজুর প্রাকৃতিক শর্করা ও পটাসিয়ামের উৎস, যা দ্রুত রক্তে শর্করার মাত্রা স্থিতিশীল করে।
- এরপর ১০-১৫ মিনিট বিরতি নিন।
- তারপর হালকা স্যুপ, সবজির সালাদ বা ফলমূল গ্রহণ করুন।
এই পদ্ধতিতে পাকস্থলী ধীরে ধীরে প্রস্তুত হয়, বদহজমের ঝুঁকি কমে এবং অতিরিক্ত খাওয়া এড়ানো যায়। খাবার ভালোভাবে চিবিয়ে খেলে তৃপ্তির অনুভূতি বাড়ে এবং ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে থাকে।
সুষম প্লেট গঠন: ওজন নিয়ন্ত্রণের মূল কৌশল
রমজানে খাবারের গঠন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- প্লেটের অর্ধেক অংশ রাখুন শাকসবজি (শসা, টমেটো, লেটুস, গাজর)।
- এক-চতুর্থাংশ রাখুন প্রোটিন (মাছ, চর্বিহীন মাংস, ডিম, ছোলা, ডাল, দই)।
- বাকি অংশ রাখুন নিয়ন্ত্রিত গোটা শস্য (বাদামি চাল, ওটস, রুটি)।
এ ধরনের সুষম প্লেট দীর্ঘক্ষণ তৃপ্তি দেয়, রক্তে শর্করার ওঠানামা কমায় এবং অযথা ক্যালরি বাড়ায় না। ছোট প্লেট ব্যবহার ও আগে থেকে অংশ নির্ধারণ করলেও অতিরিক্ত খাওয়া কমানো সম্ভব।
মনোযোগী খাওয়া: অতিরিক্ত গ্রহণ রোধের কার্যকর উপায়
অতিরিক্ত খাওয়া অনেক সময় অভ্যাস বা মানসিক কারণে ঘটে।
- খাওয়ার সময় টিভি, মোবাইল বা স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন।
- প্রতিটি লোকমা ধীরে চিবিয়ে খান।
- পেট অর্ধেক ভরলে থামুন।
এতে হজম প্রক্রিয়া সহজ হয় এবং ওজন নিয়ন্ত্রণে থাকে।
মিষ্টি ও ভাজা খাবার: ঐতিহ্য বজায় রেখে ভারসাম্য
রমজানের ঐতিহ্য হিসেবে মিষ্টি ও ভাজা খাবার পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে—
- ইফতার শুরু করুন সুষম খাবার দিয়ে।
- ভাজা খাবারের বদলে বেইকড বা গ্রিলড বিকল্প বেছে নিন।
- ভারী সিরাপজাত মিষ্টির পরিবর্তে তাজা ফল, দই-মধু বা কম চিনিযুক্ত ঘরোয়া ডেজার্ট গ্রহণ করুন।
এতে ঐতিহ্য বজায় থাকবে, স্বাস্থ্যের ক্ষতিও কম হবে।
সেহরি বাদ দেবেন না: সারাদিনের শক্তির ভিত্তি
সেহরি বাদ দিলে সারাদিনের ক্ষুধা তীব্র হয় এবং ইফতারে অতিরিক্ত খাওয়ার ঝুঁকি বাড়ে।
- সেহরিতে রাখুন ওটস, ডিম, দই, ফল, বাদাম, সবজি ও গোটা শস্য।
- প্রোটিন ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার দীর্ঘক্ষণ শক্তি জোগায়।
- সেহরির আগে পর্যাপ্ত পানি পান করুন, যাতে ডিহাইড্রেশন এড়ানো যায়।
- রাতের খাবার হালকা রাখুন।
রমজানে সুস্থ থাকতে হলে সংযম, সচেতন খাদ্যাভ্যাস ও মনোযোগী খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। পরিকল্পিত ইফতার ও পুষ্টিকর সেহরি শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণেই নয়, বরং পুরো রমজানজুড়ে সুস্থ ও প্রাণবন্ত থাকতে সহায়তা করবে।
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
পাকিস্তান সিরিজ দিয়ে ওয়ানডে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু বাংলাদেশের
মাদারীপুরে হত্যাকাণ্ডের জেরে হাতবোমা বিস্ফোরণ ঘাটিয়ে ৪০ বসতঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট
জ্বালানি সংকটে কমেছে দূরপাল্লার বাসের ট্রিপ, ঈদযাত্রায় ভোগান্তির শঙ্কা