February 21, 2026
Saturday, February 21st, 2026, 7:55 pm

টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্লেষণ: অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করাই তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ

 

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতা নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত এই প্রথম নির্বাচনে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞার কারণে অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামীর নতুন করে আবির্ভাবও ঘটেছে। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার পর থেকে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিই পালাক্রমে ক্ষমতায় ছিল। জামায়াত এককভাবে কখনো রাষ্ট্রক্ষমতায় না থাকলেও দুর্নীতিতে না জড়ানোর দাবি তাদের রাজনৈতিক অবস্থানকে আলাদা করেছে। এবার তারা পশ্চিমবঙ্গ সীমান্তবর্তী অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য সমর্থন পেয়েছে।

নিরঙ্কুশ ক্ষমতা, কিন্তু অর্থনীতিই নির্ধারণ করবে সাফল্য

জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে বিএনপি সরকার শুরুতে আইন প্রণয়ন ও নীতিগত সিদ্ধান্তে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও অর্থনীতিতে ব্যর্থতা বড় রাজনৈতিক চাপে ফেলতে পারে। একদিকে জামায়াত, অন্যদিকে আওয়ামী লীগের সুপ্ত জনসমর্থন—দুই দিক থেকেই চাপ বাড়তে পারে।

কর্মসংস্থান ও দুর্নীতি নিয়ে তরুণ প্রজন্মের অসন্তোষ সহজে প্রশমিত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সদ্য শপথ নেওয়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে কঠোর পরিশ্রম করতে হবে। তবে তার রাজনৈতিক সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হবে অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা।

জিডিপি দ্বিগুণের লক্ষ্য: বড় চ্যালেঞ্জ

বিএনপি ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি ৪৬০ বিলিয়ন ডলার থেকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই লক্ষ্য অর্জনে প্রায় ৯ শতাংশ বার্ষিক প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন, যেখানে বর্তমানে প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশ।

দলটি শিক্ষা খাতে বরাদ্দ জিডিপির ২ শতাংশ থেকে ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে ০.৭৫ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। তবে রাজস্ব বাড়ানোর বিশ্বাসযোগ্য রূপরেখা এখনো স্পষ্ট নয়। প্রবৃদ্ধি দ্বিগুণের বেশি করতে হলে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২৩ শতাংশ থেকে ৩৫ শতাংশে উন্নীত করতে হবে—যা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

উচ্চ সুদহার, খাদ্যমূল্য ও মধ্যস্বত্বভোগী সংকট

গত দেড় বছর ধরে উচ্চ সুদহার নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সমালোচনা রয়েছে। অনেকের মতে, শুধু মুদ্রানীতি নয়; বরং বণ্টনব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাই উচ্চ খাদ্যমূল্যের মূল কারণ।

দেশের জিডিপির ১২ শতাংশ আসে কৃষি থেকে এবং প্রায় ৫ কোটি মানুষ (মোট কর্মসংস্থানের ৪৪ শতাংশ) এ খাতে যুক্ত। শহরে খাদ্যমূল্য কমানো ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে খামার থেকে শহর পর্যন্ত সরবরাহ ব্যবস্থায় মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং ফসল কাটার পরবর্তী লজিস্টিক খাতে বিনিয়োগ জরুরি হয়ে উঠেছে।

রেমিট্যান্স: আইএমএফের চেয়েও বড় শক্তি

প্রবাসী আয় বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভরসা। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা International Monetary Fund (আইএমএফ)-এর যেকোনো সহায়তা কর্মসূচির চেয়েও রেমিট্যান্স বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

প্রায় ১ কোটি বাংলাদেশি বিদেশে কাজ করছেন, বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে। মাত্র তিন মাসে তারা প্রায় ৭.৫ বিলিয়ন ডলার দেশে পাঠিয়েছেন—যা আইএমএফের পুরো সহায়তা প্যাকেজের সমান। ২০২৩ সালের ২১ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০২৫ সালে রেমিট্যান্স বেড়ে ৩০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।

তবে অবৈধ হুন্ডি চ্যানেলে পুনরায় ঝুঁকে পড়লে বাংলাদেশ ব্যাংক গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ হারাতে পারে।

শ্রম রপ্তানি ও দুর্নীতির চ্যালেঞ্জ

প্রতি বছর প্রায় ১০ লাখ বাংলাদেশি বিদেশে কাজের জন্য যান। কিন্তু শ্রম রপ্তানি খাতে দুর্নীতি ও শোষণ বড় সমস্যা। কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য শ্রমবাজার সীমিত করেছে, ফলে দেশটি বিপজ্জনকভাবে সৌদি আরবের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

এলডিসি উত্তরণ: সামনে বড় ঝুঁকি

২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণ করবে। ফলে রপ্তানিকারকরা যে বিশেষ বাণিজ্য সুবিধা পেতেন, তা হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। নতুন প্রশাসনকে শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত আর্থিক খাত পুনর্গঠন করতে হবে।

অর্থনৈতিক পুনর্গঠন প্রতিবেদনের নেতৃত্ব দেওয়া অর্থনীতিবিদ খান আহমেদ সাঈদ মুরশিদ বাস্তববাদী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তার মতে, বড় পরিকল্পনার পাশাপাশি ‘উচ্চ-প্রভাবশালী ছোট প্রকল্পে’ দ্রুত বাস্তবায়ন জরুরি।

সার্ক না আসিয়ান—কোন পথে কূটনীতি?

নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি আসিয়ানে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করলেও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রথম বক্তব্যে তারেক রহমান জোর দেন South Asian Association for Regional Cooperation (সার্ক)-এর ওপর—যা ১৯৮০ সালে তার বাবা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। তবে সার্ক বর্তমানে কার্যত অকার্যকর।

অন্যদিকে আসিয়ানভুক্ত মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্ত রয়েছে এবং ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে অবস্থান করছে। আসিয়ানে যুক্ত হলে বৈচিত্র্যময় সরবরাহ শৃঙ্খল ও বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্র: ভারসাম্যের কূটনীতি

শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান এবং তাকে প্রত্যর্পণে দিল্লির অনীহা দুই দেশের সম্পর্কে উত্তেজনা তৈরি করেছে। ভারতের বিরুদ্ধে একপেশে বিদ্যুৎ চুক্তির অভিযোগও রয়েছে, বিশেষ করে আদানি গ্রুপের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে।

চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার। বেইজিং বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের অংশ হিসেবে ২৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে ড্রোন কারখানা স্থাপনের চুক্তিও হয়েছে।

অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির একক বৃহত্তম বাজার। ঢাকায় নবনিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন বলেছেন, চীনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার ঝুঁকি তুলে ধরা হবে এবং মার্কিন বিনিয়োগকারীরা সরকারের সুস্পষ্ট বার্তার অপেক্ষায় আছেন।

সামনে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সামনে বিশাল চ্যালেঞ্জ থাকলেও অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর সুযোগও রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রাজনীতিতে তিনি কতটা প্রভাব ফেলতে পারেন—এখন সেটিই দেখার বিষয়।

এনএনবাংলা/