February 24, 2026
Tuesday, February 24th, 2026, 4:03 pm

নড়াইলে বাবা—ছেলেসহ ৪জন নিহতের ঘটনায় আটক ৬

নড়াইল প্রতিনিধি :

নড়াইল সদর উপজেলার বড়কুলা এলাকায় পাল্টাপাল্টি হামলা ও সংর্ঘষে বাবা—ছেলেসহ চারজন নিহত হওয়ার ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। আটককৃতরা হলেন— মো. তুফান মোল্যা (৩০), লাজুক ওরফে সূর্য সিকদার (৩২), সবুর মোল্যা (৩৬), জসিম মোল্যা (৩০), হালিম ফকির (৬০) ও রনি সিকদার (৩৩)। আটককৃত রনি সিকদার (৩৩) কে সোমবার রাতে সদরের তারাপুর গ্রাম থেকে আটক করে র‌্যাব—৬। অপর ৫ জনকে নড়াইল পুলিশ ও গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে আটক করেছে। নড়াইল সদর থানার ওসি ওলি মিয়া আটকের বিষয়টি মঙ্গলবার দুপুরে নিশ্চিত করেছেন। তবে এ ঘটনায় বেলা ৩টা পর্যন্ত  কোন পক্ষ মামলা করেনি। এদিকে, নিহতদের মরদেহ ময়না তদন্তের পর স্বজনদের নিকট হস্তান্তর করা হয়েছে।

সোমবার ভোররাতে উপজেলার সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের বড়কুলা এলাকায় দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। ঘটনাস্থলে নিহত হন খলিল শেখ ও তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ এবং তাঁদের প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখ। এছাড়া গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হলে মারা যান ওসিকুর ফকির নামের আরও একজন। সংঘর্ষে আহতরা জেলা হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে আটকের ভয়ে কেউ হাসপাতালে অবস্থান করছেন না বলে জানা গেছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নে দু’টি পক্ষের বিরোধ চলে আসছিল। একটি পক্ষের নেতৃত্ব দেন ওই ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যা। আরেক পক্ষের নেতৃত্ব দেন সাবেক চেয়ারম্যান উজ্জ্বল শেখ। উজ্জ্বল শেখ ও খায়রুজ্জামানের (খায়ের) বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা রয়েছে। একটি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে উজ্জ্বল বর্তমানে জেলে আছেন তিনি। অপরদিকে, খায়রুজ্জামান (খায়ের) মোল্যা একটি মামলায় এলাকাছাড়া রয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, খায়রুজ্জামান ও উজ্জ্বল শেখ দুই পক্ষ বিভিন্ন সময়ে এলাকার সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন ইস্যুতে একে—অপরের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। কয়েক দিন ধরে দুটি পক্ষের মধ্যে আধিপত্য ও পূর্ববিরোধের জের ধরে উত্তেজনা চলছিল। মারামারি, বাড়ি ঘরে হামালা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।

উজ্জল গ্রুপের লোকদের অভিযোগ, সোমবার ভোরে খায়রুজ্জামান পক্ষের লোকজন বড়কুলা গ্রামে প্রতিপক্ষের লোকজনের ওপর হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলে নিহত হন উজ্জ্বল শেখের পক্ষের খলিল শেখ ও তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ এবং প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখ। পরে হামলাকারীদের প্রতিরোধ এবং পাল্টা হামলা চালালে খায়রুজ্জামানের পক্ষের ওসিকুর ফকির নামের একজন গুরুতর আহত হন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনায় আহতরা নড়াইল সহ বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

ওইদিন খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে থাকা খলিল, তাহাজ্জুদ ও ফেরদৌসের মরদেহ উদ্ধার করতে গেলে পুলিশ ও প্রশাসনের লোকজনের প্রতি চড়াও হন নিহত ব্যক্তিদের স্বজনেরা। তাঁরা দীর্ঘ সময় লাশ আটকে রাখেন। পরে পুলিশ ও নড়াইল—১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের প্রচেষ্টায় দুপুরের দিকে লাশগুলো উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য হাসপাতালে পাঠাতে রাজি হন নিহত ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যরা।

নিহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সাবেক চেয়ারম্যান খায়রুজ্জামান মোল্যার বাড়ি সদরের সিঙ্গাশোলপুর ইউনিয়নের তারাপুর গ্রামে। বড়কুলায় নিহত খলিল শেখ ও তাঁর ছেলে তাহাজ্জুদ শেখ এবং প্রতিবেশী ফেরদৌস শেখদের সাবেক বাড়িও তারাপুরে। সেখানে খায়রুজ্জামান (খায়ের) মোল্যাদের সঙ্গে বিরোধের কারণেই বছর দশেক আগে তারাপুর থেকে বড়কুলায় এসে বসতি গড়ে তুলেছিলেন তাঁরা। গ্রাম বদলালেও ইউনিয়নের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে খায়রুজ্জামানের বিরোধী অবস্থান ছিল খলিলদের।

ওই এলাকার মাসুম মুন্সি বলেন, এ দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন যাবৎ বিরোধ চলে আসছিল। বিরোধের জেরে খলিলরা তারাপুর গ্রাম ছেড়ে বড়কুলা গ্রামে এসে বসবাস শুরু করেন। এখানে এসেও বিরোধ মিমাংসা হয়নি। সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবে একে অপরের শত্রু ছিল।

নিহত খলিল শেখের স্ত্রী মঞ্জুরা বেগম বলেন, তারাপুর গ্রাম থেকে খায়রুজ্জামান দেশি অস্ত্রসস্ত্রসহ ৫০ থেকে ৫৫ জন লোক আমাদের বাড়িতে হামলা করে এবং আমার স্বামী ও ছেলেকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করে। এছাড়া আমাদের পক্ষের ফেরদৌসকে তারা কুপিয়ে হত্যা করে।

এদিকে ঘটনার পর থেকে খায়রুজ্জামানের বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত খায়রুজ্জামান মোল্যা বলেন, অহেতুক রাজনৈতিক কারনে আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। বড়কুলা গ্রামে ওসিকুরদের সাথে তাঁদের বিরোধ চলে আসছিল। তাঁরা হামলা পাল্টা হামালা চালিয়েছেন। আমাকে রাজনৈতিক ভাবে একটি মহল ফাঁসানোর চেষ্টা করছে।

নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ওলি মিয়া বলেন, বড়কুলা গ্রমে নিহতের ঘটনায় ৬ জনকে আটক করা হয়েছে। তবে এ ঘটনায় এখনও কোনো পক্ষ মামলা করেনি। ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়ন করা হয়েছে। এলাকার পরিবেশ এখন স্বাভাবিক আছে।

মুন্না শেখ মারা যাননি

নড়াইলে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুই গ্রুপের মধ্যে সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) ভোররাতে সদর উপজেলার বড়কুলা গ্রামে ভয়াবহ সংঘর্ষে পিতা—পুত্রসহ উভয় পক্ষের পাঁচজন নিহত এবং অন্তত ১২ জন আহত হয়েছেন বলে খবর প্রকাশিত হয়। নিহতের তালিকায় মুন্না শেখের নাম প্রকাশ হলেও তিনি মারা যাননি। নিহত ফেরদৌস শেখের ছেলে মুন্না শেখেকে গুরুতর আহত অবস্থায় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা গেছেন বলে এলাকাবসি জানিয়েছিলেন। তবে তিনি মারা যাননি বলে জানিয়েছেন মুন্না শেখের চাচাতো ভাই আকাশ শেখ। মুন্না খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মঙ্গলবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) তাঁর পিতা নিহত ফেরদৌস শেখের জানাজার নামাজ ও দাফন সম্পন্ন করতে বড়কুলা গ্রামে নিজ বাড়িতে এসেছেন।