আমেরিকা ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান সশস্ত্র সংঘাত এবার বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডর—হরমুজ প্রণালি—কে কেন্দ্র করে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। সোমবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে এই জলপথ বন্ধ ঘোষণা করলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা শুরু হয়।
ইরান ভূখণ্ডে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র জবাবে তেহরান এই কঠোর পদক্ষেপ নেয়। ইরানি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে আইআরজিসির প্রধান কমান্ডারের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইব্রাহিম জাবারি ঘোষণা দেন, “হরমুজ প্রণালি এখন থেকে বন্ধ। আমাদের যোদ্ধারা এই পথে অনুপ্রবেশকারী যেকোনো জাহাজে আগুন ধরিয়ে দেবে।” তিনি আরও হুঁশিয়ার করেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চল থেকে এক ফোঁটা তেলও পাবে না; প্রয়োজনে আঞ্চলিক তেল পাইপলাইনগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
গত ৪৮ ঘণ্টায় পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়েছে। ওমান উপকূলসহ আশপাশের এলাকায় অন্তত পাঁচটি তেলবাহী ট্যাংকার ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি ট্যাংকারে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের খবর মিলেছে। এসব হামলায় অন্তত দুজন নাবিক নিহত হয়েছেন।
এদিকে প্রণালির প্রবেশমুখে প্রায় ১৭০টি বাণিজ্য জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার আটকা পড়েছে। বিমা জটিলতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে তারা এগোতে পারছে না। বিশ্বের শীর্ষ শিপিং কোম্পানি Maersk ও Hapag-Lloyd এই রুটে তাদের সব ধরনের চলাচল অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে।
জ্বালানি বাজারে এর প্রভাব ইতিমধ্যেই স্পষ্ট। মঙ্গলবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের বেঞ্চমার্ক Brent Crude-এর দাম ব্যারেলপ্রতি ১.৭০ ডলার বা ২.২ শতাংশ বেড়ে ৭৯.৪৪ ডলারে দাঁড়ায়। আগের দিন লেনদেনের একপর্যায়ে দাম ৮২.৩৭ ডলারে পৌঁছেছিল, যা ২০২৫ সালের জানুয়ারির পর সর্বোচ্চ। যদিও দিনের শেষে কিছুটা কমে তা ৭ শতাংশ বৃদ্ধিতে স্থির হয়। বাজার বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, অবরোধ দীর্ঘস্থায়ী হলে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে।
এদিকে জাহাজ বিমাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো ৫ মার্চ থেকে এই অঞ্চলের জন্য ‘ওয়ার রিস্ক কভার’ বাতিলের নোটিশ দিয়েছে। ফলে কার্যত এই রুটে জাহাজ চলাচল প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
ইউরোপ ও এশিয়ার সামনে জ্বালানি সংকট
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে বা তেল-গ্যাস অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এশিয়া ও ইউরোপ। তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) সরবরাহ বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে।
কাতার ইতোমধ্যে জানিয়েছে, ইরান থেকে তাদের একটি স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর পাওয়ার পর তারা এলএনজি উৎপাদন বন্ধ করেছে। বিশ্বের মোট এলএনজির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। কাতার তাদের রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশ এই পথেই পাঠায়।
এমএসটি ফাইন্যান্সিয়ালের জ্বালানি বিশ্লেষক সল কাভোনিকের মতে, কাতারি এলএনজির কোনো বিকল্প সহজে পাওয়া যাবে না। উৎপাদন বন্ধ দীর্ঘায়িত হলে বা অবকাঠামোর ক্ষতি বাড়লে ২০২২ সালে রাশিয়া ইউরোপে পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার সময় যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তার চেয়েও বড় সংকট দেখা দিতে পারে।
এশিয়ার দেশগুলোতেও উদ্বেগ বাড়ছে। হরমুজ দিয়ে প্রবাহিত তেলের প্রায় ৭০ শতাংশই যায় এশিয়ায়। বিশেষ করে চীন, ভারত, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া তাদের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশের জন্য এই পথের ওপর নির্ভরশীল। ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতিতে তেলের মূল্যবৃদ্ধি সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।
বিকল্প রুটের সীমাবদ্ধতা
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের কিছু বিকল্প পাইপলাইন থাকলেও তা বৈশ্বিক চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেলের বিকল্প ব্যবস্থা স্বল্প সময়ে করা সম্ভব নয়। অনেক কোম্পানি এখন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ অব গুড হোপ ঘুরে জাহাজ পাঠানোর কথা ভাবছে। এতে পরিবহন সময় অন্তত দুই সপ্তাহ বাড়বে এবং খরচ কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে।
সব মিলিয়ে বর্তমান সংকট শুধু একটি আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের কেউই আপসের পথে না আসায় এক সম্ভাব্য বৈশ্বিক মন্দার আশঙ্কা ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
মার্কিন নাগরিকদের দ্রুত ১৪ দেশ ছাড়তে নির্দেশ
দুদকের চেয়ারম্যানসহ পুরো কমিশনের পদত্যাগ
বাহরাইনে মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে হামলার দাবি ইরানের