বাগেরহাটের মোংলা উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন শেহালাবুনিয়ায় আব্দুর রাজ্জাকের বাড়িতে এখন অসংখ্য মানুষের ভিড়। শোক আর কান্নায় স্তব্ধ পুরো এলাকা। কারো মুখে কোনো কথা নেই, শুধু চারদিকে ভেসে আসছে স্বজনদের আহাজারি।
নিহত রাজ্জাকের প্রতিবেশী শরীফ হাবিবুর রহমান বলেন, “একসঙ্গে এতগুলো লাশ আগে কখনো দেখিনি। এটা সহ্য করার মতো না। যে বাড়িতে হাসি-আনন্দ থাকার কথা ছিল, সেখানে এখন কান্নার রোল।”
গতকাল খুলনা-মোংলা মহাসড়কের রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত বর-কনেসহ ১৪ জনের মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিবারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবার রাতে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও রামপাল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে ময়নাতদন্ত ছাড়াই মরদেহ হস্তান্তর করা হয়।
নিহতদের মধ্যে বর, তাঁর বাবা, ভাই-বোন, ভাবি এবং ভাগনে-ভাগনিসহ একই পরিবারের ৯ জন রয়েছেন। শুক্রবার ভোরে তাঁদের মরদেহ বাগেরহাটের মোংলার শেহালাবুনিয়ায় পৌঁছায়। অন্যদিকে কনে, তাঁর বোন, দাদি ও নানির মরদেহ নেওয়া হয় খুলনার কয়রা উপজেলায়।

পাশাপাশি খোঁড়া হয়েছে ৯টি কবর
মোংলা পৌর কবরস্থানে আব্দুর রাজ্জাক ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জন্য পাশাপাশি ৯টি কবর প্রস্তুত করা হয়েছে।
কবরস্থানের খাদেম মুজিবুর ফকির বলেন, “পরিবারের সম্মতিতে একই স্থানে ৯টি কবর প্রস্তুত করেছি। ১৭ বছর ধরে কবরস্থানের দায়িত্ব পালন করছি। কখনো একসঙ্গে একই পরিবারের এত সদস্যের কবর খুঁড়িনি। ঘটনাটা খুবই হৃদয়বিদারক।”
যেভাবে ঘটেছিল দুর্ঘটনা
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, বুধবার রাতে খুলনার কয়রা উপজেলার আমাদী ইউনিয়নের নাকসা গ্রামের বাসিন্দা আবদুস সালাম মোড়লের মেয়ে মার্জিয়া আক্তারের (মিতু) সঙ্গে বিয়ে হয় মোংলা পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আব্দুর রাজ্জাকের ছোট ছেলে আহাদুর রহমান ছাব্বিরের।
বিয়ের অনুষ্ঠান শেষে বৃহস্পতিবার দুপুর সোয়া ১২টার দিকে বর-কনেসহ দুই পরিবারের ১৪ জন একটি মাইক্রোবাসে করে কয়রা থেকে মোংলার উদ্দেশে রওনা দেন।
মোংলার কাছাকাছি রামপাল উপজেলার বেলাই ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে বিপরীত দিক থেকে আসা নৌবাহিনীর একটি স্টাফ বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মাইক্রোবাসের চালকসহ ১৪ জন নিহত হন। আহত অবস্থায় একজনকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

৯ মসজিদ থেকে আনা হয়েছে খাটিয়া
শুক্রবার সকালে শেহালাবুনিয়ায় গিয়ে দেখা যায়, শত শত মানুষ ভিড় করেছেন রাজ্জাকের বাড়িতে। হৃদয়বিদারক এই ঘটনার খবর পেয়ে আত্মীয়স্বজন ছাড়াও উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ ছুটে আসছেন।
রাজ্জাকের ছোট ভাই মো. সাজ্জাদ সরদার বলেন, “আমাদের বেড়ে ওঠা মোংলাতেই। তবে গ্রামের বাড়ি কয়রায়। রাজ্জাক ভাই তাঁর মেয়েরও বিয়ে দিয়েছিলেন কয়রায়। এবার ছেলের বিয়ে দিলেন। পুরো পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল।”
তিনি আরও বলেন, “আশপাশের ৯টি মসজিদ থেকে খাটিয়া আনা হয়েছে। গোসল শেষ করে একে একে ৯ স্বজনকে খাটিয়ায় রাখা হয়েছে। জুমার নামাজের পর উপজেলা পরিষদ চত্বরে জানাজা শেষে পৌর কবরস্থানে তাঁদের দাফন করা হবে।”
নিহতদের পরিচয়
নিহতরা হলেন বর আহাদুর রহমান ছাব্বির, তাঁর বাবা আব্দুর রাজ্জাক, ভাই আব্দুল্লাহ সানি, বোন উম্মে সুমাইয়া ঐশী, ঐশীর ছেলে সামিউল ইসলাম ফাহিম, বড় ভাই আশরাফুল আলম জনির স্ত্রী ফারহানা সিদ্দিকা পুতুল, তাঁদের সন্তান আলিফ, আরফা ও ইরাম।
এ ছাড়া নিহত হয়েছেন কনে মার্জিয়া আক্তার (মিতু), তাঁর ছোট বোন লামিয়া আক্তার, দাদি রাশিদা বেগম, নানি আনোয়ারা বেগম এবং মাইক্রোবাস চালক নাঈম।
মাইক্রোবাস চালক নাঈমের বাড়ি বাগেরহাটের রামপাল উপজেলার পেড়িখালি ইউনিয়নের সিংগেরবুনিয়া গ্রামে। জুমার নামাজের আগে তাঁর গ্রামের বাড়িতেই দাফন সম্পন্ন হয়েছে।
মোংলা শহরে বর ছাব্বিরের একটি মোবাইল ফোনের দোকান ছিল। আর কনে মিতু কয়রার নাকসা আলিম মাদ্রাসার আলিম প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন।
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
মালদ্বীপে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ, ৫ বাংলাদেশি শ্রমিক নিহত
জাতীয় স্মৃতিসৌধে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের শ্রদ্ধা নিবেদন
ঈদযাত্রা হবে নির্বিঘ্ন, ট্রেনের ছাদে ওঠার সব পথ বন্ধ: রেলমন্ত্রী