সোশ্যাল মিডিয়ায় কয়েকদিন ধরে আলোচিত ও সমালোচিত নাম মনিকা কবির। রুশ বংশোদ্ভূত এ মডেল নানা বিতর্কে জড়িয়ে খবরের শিরোনামে উঠে এসেছেন । সম্প্রতি রাজধানীর গুলশানে মানসিক ভারসাম্যহীন এক বৃদ্ধ পথচারীকে মারধর, কটূক্তির ঘটনার তার বিরুদ্ধে ঢাকার আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে। এবার আইনের শাসন, জনশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে মনিকাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত।
কে এই মনিকা কবির
রুশ বংশোদ্ভূত মনিকা কবিরের প্রকৃত নাম মারিয়া ভ্যালিরিয়েভনা। রাশিয়ায় জন্ম নেওয়া এবং মস্কোতে বেড়ে ওঠা এই মডেলেকে তার পরিবার ‘মনিশকা’ নামে ডাকে। তার মা রুশ নাগরিক ম্যারিয়া গোজেন এবং বাবা একজন ভারতীয় চামড়া ব্যবসায়ী। বাবার ব্যবসার সূত্রে ২০১২ সালে প্রথম বাংলাদেশে আসা মনিকার খোলামেলা পোশাক ও যত্রতত্র চলাফেরা নিয়ে আগে থেকেই নেটিজেনদের মাঝে নানা বিতর্ক ছিল, যা সাম্প্রতিক এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর নতুন মাত্রা পেয়েছে।

যে ঘটনায় মনিকার বিরুদ্ধে মামলা
গত ১০ মার্চ (মঙ্গলবার) বিকাল ৪টার দিকে গুলশান-২ রয়েল ব্লুয়ের বিপরীত পাশ দিয়ে এক বৃদ্ধ চলাচল করছিলেন। রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে মনিকা কবির টিকটক করার এক পর্যায়ে বৃদ্ধ ব্যক্তির ব্যাগের কোনা তার গায়ে লাগে। মনিকা ওই বৃদ্ধকে অশ্লীল গালিগালাজ শুধু নয়, ব্যাগ নিক্ষেপ করে মারধর করে। ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনার ভিডিও ধারণ করে পরবর্তীকালে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেয়। যার ফলে ভূক্তভোগী ব্যক্তিকে আরও অপমান ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জাকির হোসাইনের আদালতে ঢাকা জেলা দক্ষিণের ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি সাজ্জাদ আল ইসলাম এ মামলা করেন। আদালত বাদীর জবানবন্দি রেকর্ড করে গুলশান থানার ওসিকে অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সাজ্জাদ আল ইসলাম।
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর লিগ্যাল নোটিশ
এদিকে আইনের শাসন, জনশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে মনিকাকে লিগ্যাল নোটিশ পাঠিয়েছেন বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত।
এ বিষয়ে তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, প্রথমত আমি একজন আইনজীবী, এর পাশাপাশি বাংলাদেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আইনের শাসন, জনশৃঙ্খলা ও সামাজিক মূল্যবোধ রক্ষার স্বার্থে মনিকা কবিরকে লিগ্যাল নোটিশটি দিয়েছি। কারণ বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী যে কেউ, সে বিদেশি হোক কিংবা বাংলাদেশি—যদি সে কোনো আইন লঙ্ঘন করে তাহলে তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে।
মনিকার পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী জানা গেছে, ২০২৫ সালের ১৬ জানুয়ারি তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে গিয়েছে। সে বর্তমানে অবৈধ নথিপত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশে অবস্থান করছে। বৈধ ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বিভিন্ন বাণিজ্যিক কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করছে। এর পাশাপাশি বিভিন্ন অশ্লীল কন্টেন্ট তৈরি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারও করছে।

জান্নাতুল ফেরদৌস জান্নাত আরও বলেন, বাংলাদেশে থাকতে হলে প্রথমত, বৈধ কাগজপত্র প্রয়োজন হবে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (BIDA) থেকে ওয়ার্ক পারমিটও নিতে হবে বৈধভাবে কাজ করার জন্য। প্রথমত তার বাংলাদেশে কাজ করার জন্য কোনো বৈধ ওয়ার্ক পারমিট নেই। বিডা থেকেও মনিকা বৈধ ওয়ার্ক পারমিট পাওয়ার জন্য আবেদন করেনি। ফলে বাণিজ্যিকভাবে কাজ বা কোনো ধরনের প্রমোশনাল কাজ সে করতে পারে না।
সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী জানান, মনিকা কবির বাংলাদেশে একজন ‘গুপ্ত’ হিসেবে আছেন। সে কোনো দেশের এজেন্ট হিসেবে বাংলাদেশে কাজ করছে। যার কারণে মনিকা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অর্থাৎ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে বাংলাদেশকে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের উসকানিমূলক এবং এর পাশাপাশি বিভিন্ন অশ্লীল মন্তব্য করে আসছে। তার অসংলগ্ন জীবনযাপনের পাশাপাশি সন্দেহভাজন কিছু মহলের সাথে মনিকার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বা যাতায়াত আছে। এটি বাংলাদেশের জননিরাপত্তার জন্য খুবই উদ্বেগের বিষয়।
আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। মনিকা পাবলিক প্লেসে অশালীন ভিডিও কনটেন্ট তৈরি করছে, ড্রেস চেঞ্জ করছে। মেট্রোরেলে ভিন্ন ধরণের অশালীন অঙ্গভঙ্গিই শুধু করেনি, অপরিচিত পুরুষের পায়ের উপর শুয়ে পড়ছে ব্ল্যাঙ্কেট গায়ে দিয়ে। এগুলো এক ধরণের ‘পাবলিক ন্যুইসেন্স’ তৈরি করেছে। রোজার মধ্যে পাবলিক প্লেসে মানসিক ভারসাম্যহীন একজনকে মনিকা মেরেছে। পাবলিক প্লেস তো ব্র্যান্ড প্রমোশনের জায়গা নয়। ওই ভিডিওটাতে লক্ষ্য করলে দেখবেন যে লোকটি জানেও না, জাস্ট লোকটির ব্যাগের স্পর্শ হয়তো তার শরীরে লেগেছে। বাংলাদেশের জনগণকে প্রতিনিয়ত হ্যারাসমেন্ট করে যাচ্ছে মনিকা, যা আইনের শাসন ও জননিরাপত্তার জন্য হুমকি।

সুপ্রিম কোর্টের এ আইনজীবী আরও জানান, আমি লিগ্যাল নোটিশটা পাঠিয়ে দিয়েছি। মনিকাকে সাতদিন সময় দেওয়া হয়েছে। এখন এর মধ্যে তার আইনজীবী বা তিনি কি প্রতিক্রিয়া দেয় আমি সেটার জন্য অপেক্ষা করছি। যদি মনিকা সাতদিনের মধ্যে জবাব না দেয়, সেক্ষেত্রে আমরা মামলাতে যাবো।
আইনজীবী আইনজীবী জান্নাতুল ফেরদৌস থেকে আরও জানা গেছে, রাশিয়ান মডেল মনিকা নিজের সুবিধা মতো একেক সময় ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তিগত ইনফরমেশন দিয়েছে, যা সন্দেজনক। এবং এটি বাংলাদেশের আইন ও স্বার্থের পরিপন্থী। কখনও মনিকা বলেছে, সে তুরস্কের নাগরিক। আবার কয়েকদিন পর বলছে, তার দাদার বাড়ি ভারতে। এরপর শোনা গেল, মনিকা পাঁচ বছর থেকে বাংলাদেশে এসে বসবাস করছে। যদি স্টুডেন্ট ভিসায় এসে থাকে, তার পাসপোর্টের মেয়াদ ইতিমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে অবৈধভাবে থেকে অবৈধভাবেই মনিকা কাজ করে যাচ্ছে। এটি ফরেনার্স অ্যাক্টের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন অ্যাক্টের টোটাল ভায়োলেশন। এছাড়া, তার অশ্লীল কনটেন্টগুলো সাইবার সুরক্ষা আইনে ভায়োলেশন পর্যায়ে পড়ে।

এ বিষয়ে মনিকা কবিরের বক্তব্য
সাম্প্রতিক ঘটনা, মামলা ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবীর লিগ্যাল নোটিশের পর মনিকা কবির ক্ষোভ উগড়ে দিয়ে বলেছেন, আপনারা মেয়েদের ওপর পানি ফেলেন দেশে! এখানে কোনো ফরেনার মেয়ে আসবে না আমি চলে গেলে, আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি। আমি বাংলাদেশকে অনেক অনেক… বাংলাদেশ আমাকে কষ্ট দিলে আমিও দিব বাংলাদেশকে কষ্ট। এভাবে চলবে না, আমি আপনাদের দেশের জন্য অনেক কিছু করেছি। আমি আপনাদের দেশের কালচারকে আমার দেশে রিপ্রেজেন্ট করেছি।
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
সৌদি-আমিরাতে হামলা চালিয়েছে ইরান
নারীদের স্নাতকোত্তর পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করার পরিকল্পনা: জুবাইদা রহমান
একই ছাতার আওতায় আনা হবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী