Wednesday, March 25th, 2026, 7:56 pm

নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে পাপমুক্তির মহাষ্টমী স্নানোৎসব শুরু

 

নারায়ণগঞ্জ প্রতিনিধি:

সনাতন ধর্মালম্বীদের পুণ্য স্নানোৎসব উপলক্ষে বুধবার (২৫ মার্চ) নারায়ণগঞ্জের লাঙ্গলবন্দে শুরু হয়েছে ‘পাপমুক্তির’ মহাষ্টমী মহাস্নান। প্রতি বছর চৈত্র মাসের শুক্লা তিথিতে দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে সমবেত হন। তাদের বিশ্বাস, শুক্লাঅষ্টমী তিথিতে এ নদীতে স্নানের মাধ্যমে পাপমোচন ঘটে এবং ব্রহ্মার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়।

স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির উপদেষ্টা শংকর কুমার দে জানান, বুধবার বিকাল ৫টা ১৭ মিনিটে স্নান শুরু হয়েছে এবং বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) দুপুর ২টা ৫৯ মিনিটে শেষ হবে। এবার লাঙ্গলবন্দের ২৪টি ঘাটে স্নান অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

পৌরাণিক বর্ণনা মতে, ত্রেতা যুগে ব্রাহ্মণ জমদগ্নি ও রেণুকার পুত্র পরশুরাম মাতৃহত্যার পাপ থেকে মুক্তি পেতে তপস্যা করেন। পরে নির্দেশনা অনুযায়ী চৈত্র মাসের অষ্টমী তিথিতে এক পবিত্র নদীতে স্নান করে পাপমুক্ত হন। পরবর্তীতে সেই পুণ্যধারা সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত করতে তিনি লাঙ্গল দিয়ে হিমালয় থেকে সমভূমিতে জলধারা নিয়ে আসেন। বর্তমান নারায়ণগঞ্জের বন্দর এলাকায় এসে তিনি লাঙ্গল চালানো বন্ধ করলে স্থানটির নাম হয় ‘লাঙ্গলবন্দ’।

স্নানোৎসব সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বন্দর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শিবানী সরকার জানান, পুণ্যার্থীদের সুবিধার্থে ২৪টি স্নানঘাট সংস্কার, নদের কচুরিপানা অপসারণ এবং বিশুদ্ধ পানির জন্য ৪৭টি নলকূপ স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া নারীদের জন্য পৃথক পোশাক পরিবর্তন কক্ষ ও ২০০টি অস্থায়ী শৌচাগার নির্মাণ করা হয়েছে।

জেলা পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান মুন্সি বলেন, পুণ্যার্থীদের নিরাপত্তায় দুই শিফটে প্রায় ১১০০ পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আলাদা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আনসার সদস্যরা সহযোগিতা করবেন। নৌ পুলিশও মোতায়েন থাকবে যাতে কোনো দুর্ঘটনা না ঘটে।

তিনি আরও জানান, পুরো তিন কিলোমিটার এলাকা সিসিটিভির আওতায় আনা হয়েছে। সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসক মো. রায়হান কবীর বলেন, পুণ্যার্থীদের জন্য সেবাকেন্দ্রে সরকারি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ঈদের সময় হওয়ায় মহাসড়কে চাপ বাড়তে পারে, সে বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হচ্ছে। পূজা উদযাপন পরিষদের স্বেচ্ছাসেবকদের পাশাপাশি বিএনপির ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবক দায়িত্ব পালন করবেন।

তিনি আরও বলেন, চুরি-ছিনতাই প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। দুটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের একজন এডিসি সার্বক্ষণিক দায়িত্বে থাকবেন। প্রয়োজনে সেনাবাহিনীর টিম টহলে থাকবে। এছাড়া ১০ শয্যার একটি অস্থায়ী হাসপাতাল, মেডিকেল টিম, রোগী পরিবহনের জন্য রিকশা ও ছয়টি অ্যাম্বুলেন্স প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে, তীর্থযাত্রীদের সুবিধার্থে মেডিকেল ক্যাম্প ও পরিবহন সুবিধা চালুর উদ্যোগ নিয়েছেন মডেল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও মহানগর বিএনপির নেতা মাসুদুজ্জামান মাসুদ। তার উদ্যোগে বন্দর ঘাট ও নবীগঞ্জ গুদারাঘাট থেকে আগত পুণ্যার্থীদের যাতায়াতে লেগুনা বা অটোর ব্যবস্থা রাখা হবে বলে জানা গেছে।

পাপমুক্তির আশায় দেশ-বিদেশের লাখো পুণ্যার্থীর পদচারণায় ইতোমধ্যে মুখরিত হয়ে উঠেছে ব্রহ্মপুত্র তীর। প্রায় ১০ বছর আগে বেইলি ব্রিজ ভেঙে যাওয়ার গুজবে পদদলিত হয়ে ১০ তীর্থ যাত্রীর মৃত্যু হয়। এ অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার কথা মাথায় রেখে এবার নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা হয়েছে।

লাঙ্গলবন্দ স্নানোৎসব উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দ জানিয়েছেন, এবার অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে পুণ্যার্থীর সংখ্যা বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা থেকে কয়েক হাজার বিদেশি পুণ্যার্থী ব্রহ্মপুত্রের এই পবিত্র সলিলে অবগাহন করতে ইতোমধ্যে লাঙ্গলবন্দে পৌঁছেছেন।

এদিকে স্নান উপলক্ষে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়। তিন কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বসেছে ঐতিহ্যবাহী লোকজ মেলা, যা উৎসবের জৌলুস বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। এছাড়া সাধু সন্তের ভাব সংগীতে মুখরিত হয়ে উঠেছে তীর্থ স্থান লাঙ্গলবন্দ।