বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা ক্রমেই গভীর সংকটের দিকে এগোচ্ছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এমন ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে বড় ধরনের সামরিক সংঘাত শুরু হতে পারে। এর প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্বজুড়েই এর প্রভাব পড়তে পারে।
ইরানি পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সম্প্রতি এক বিবৃতিতে সতর্ক করে বলেন, শত্রুরা প্রকাশ্যে আলোচনার কথা বললেও গোপনে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে।
একদিকে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হলেও অন্যদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক শক্তি জড়ো করছে। এতে ধারণা করা হচ্ছে, সম্ভাব্য স্থলযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে ওয়াশিংটন। এ পরিস্থিতিতে ইরানও সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, কোনো স্থল আক্রমণ হলে কঠোর প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং মার্কিন সেনাদের ওপর ‘আগুনের বৃষ্টি’ বর্ষণ করা হবে। বিষয়টি জানিয়েছে সিএনএন ও আলজাজিরা।
মার্কিন কর্মকর্তাদের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র সরকার এখনো নিশ্চিত করে বলেনি যে, আমেরিকান সেনাদের ইরানে পাঠানো হবে কিনা। তবে এমন সম্ভাবনাকে পুরোপুরি নাকচও করা হয়নি।
প্রতিরক্ষা সচিব পিট হেগসেথ সিবিএস টিভি নেটওয়ার্ককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র যতদূর যেতে হয় ততদূর যেতে প্রস্তুত। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন নিশ্চিত করতে চায়, ইরানের পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনো সফল না হয়।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট গত সপ্তাহে বলেন, এই মুহূর্তে স্থল অভিযান পরিকল্পনার অংশ নয়। তবে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সব ধরনের বিকল্প খোলা রাখছেন।
গত সপ্তাহে কংগ্রেসে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর বক্তব্য থেকেও বোঝা যায়, বিশেষ পরিস্থিতিতে স্থলবাহিনীর প্রয়োজন হতে পারে।
যুদ্ধবিরোধী জনমত
যুক্তরাষ্ট্রে ইরানে সেনা পাঠানোর বিষয়ে জনমত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বিরোধিতার দিকে ঝুঁকেছে।
এই সপ্তাহে কুইনিপিয়াক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৭৪ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানে সেনা পাঠানোর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, যাদের বেশিরভাগই বামপন্থী।
এছাড়া যুদ্ধের শুরুর সময় ওয়াশিংটন পোস্টের এক দ্রুত এসএমএস জরিপেও অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধের বিরোধিতা করেন।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পরপরই পরিচালিত রয়টার্স-ইপসোস জরিপে দেখা যায়, ৪৩ শতাংশ মানুষ যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন এবং ২৯ শতাংশ ছিলেন অনিশ্চিত। মাত্র চারজনের একজন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল হামলাকে সমর্থন করেছেন।
সম্ভাব্য বৈশ্বিক প্রভাব
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী। সংঘাতের ফলে যদি এই পথ বন্ধ হয়ে যায় বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বিশ্বব্যাপী তেল ও গ্যাসের বাজারে বড় ধরনের সংকট দেখা দিতে পারে। এর ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এছাড়া ইরান তার প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোতে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে। এতে বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার পাশাপাশি পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সম্ভাব্য এসব হামলার জেরে ইরান আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে, ফলে যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতির এ চরম সংকটময় পরিস্থিতিতে দুই পক্ষই দুই মেরুতে অবস্থান করছে। আপসের কোনো সুস্পষ্ট লক্ষণ না থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই সংঘাতের দিকে এগোচ্ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
ইরানের হামলায় ইসরায়েলের সর্ববৃহৎ তেল শোধনাগারে আগুন
ইরানের জ্বালানি অবকাঠামো ও খার্গ দ্বীপ ধ্বংসের হুঁশিয়ারি দিলেন ট্রাম্প
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিরোধীদলীয় নেতার সাক্ষাৎ