ইরান-আমেরিকা সংঘাতের ভয়াবহ এক নেপথ্য দিক সামনে এসেছে। দক্ষিণ ইরানের একটি স্পোর্টস হল ও একটি স্কুলে যুক্তরাষ্ট্রের নবনির্মিত ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা ‘প্রিজম’ (PrSM) দিয়ে হামলা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। এই হামলায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ভলিবল অনুশীলনে থাকা একদল কিশোরীও ছিল।
রহস্যময় এই ক্ষেপণাস্ত্র কী
‘প্রিজম’ বা PrSM হলো মার্কিন সেনাবাহিনীর অত্যাধুনিক ও গোপনীয় সারফেস-টু-সারফেস (ভূমি থেকে ভূমি) ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। ২০১৯ সালে ‘ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস’ (আইএনএফ) চুক্তি বাতিলের মাত্র চার মাস পর এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রকাশ্যে আসে। ওই চুক্তি অনুযায়ী আগে স্বল্প ও মধ্যম পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি নিষিদ্ধ ছিল।
এখনো পর্যন্ত পেন্টাগন এর সুনির্দিষ্ট পাল্লা, নির্ভুলতা বা বিস্ফোরকের পরিমাণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের ধারণা, আশির দশকের পুরোনো ATACMS ক্ষেপণাস্ত্রের বিকল্প হিসেবে এটি ব্যবহৃত হতে যাচ্ছে। যেখানে ATACMS-এর পাল্লা ছিল প্রায় ৩০০ কিলোমিটার, সেখানে PrSM ৫০০ কিলোমিটারের বেশি দূরের লক্ষ্যবস্তুতেও নির্ভুলভাবে আঘাত হানতে সক্ষম।
ভয়াবহ বেসামরিক প্রাণহানি
ইরানের স্থানীয় কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ ইরানের একটি জনবহুল এলাকায় ক্ষেপণাস্ত্রগুলো আঘাত হানে। বিশেষ করে একটি স্পোর্টস হলে কিশোরীরা যখন ভলিবল অনুশীলন করছিল, তখনই ঘটে ভয়াবহ বিস্ফোরণ।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের ভিজ্যুয়াল ও ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ধ্বংসাবশেষের চিহ্নগুলো ‘লকহিড মার্টিন’ নির্মিত এই নতুন ক্ষেপণাস্ত্রের সঙ্গে মিল রয়েছে। স্কুল ও খেলার মাঠের মতো বেসামরিক স্থাপনায় এ ধরনের মারণাস্ত্র ব্যবহারের ঘটনায় আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মধ্যে তীব্র উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
উৎপাদন ও যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার
লকহিড মার্টিন যুক্তরাষ্ট্রের আরকানসাস অঙ্গরাজ্যের ক্যামেরন কারখানায় এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে। গত বছরের ডিসেম্বরেই প্রথম ব্যাচের ক্ষেপণাস্ত্র মার্কিন সেনাবাহিনীর হাতে হস্তান্তর করা হয়। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি বিবেচনায় উৎপাদন চারগুণ বাড়াতে পেন্টাগন প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়ন করছে।
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, HIMARS এবং M270 মাল্টিপল লঞ্চ রকেট সিস্টেম থেকে এই ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হচ্ছে। HIMARS যানে একটি পডে দুটি PrSM বহন করা যায়, যেখানে আগের প্রযুক্তিতে মাত্র একটি ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা সম্ভব ছিল। ধারণা করা হচ্ছে, কুয়েত ও বাহরাইনে মোতায়েন মার্কিন HIMARS ইউনিট থেকেই এই হামলাগুলো চালানো হয়েছে।
পেন্টাগনের কৌশলগত পরিকল্পনা
পেন্টাগনের মতে, এই ক্ষেপণাস্ত্র তাদের সামরিক কৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। এটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে শত্রুর আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে। ভবিষ্যতে এর আরও উন্নত সংস্করণ তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে, যা চলন্ত জাহাজ বা অন্যান্য মুভিং টার্গেটেও আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
বেসামরিক স্থাপনায় পরীক্ষামূলক বা প্রোটোটাইপ অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টিকে অনেক সমর বিশেষজ্ঞ ‘অত্যন্ত বিপজ্জনক ও অনৈতিক’ হিসেবে দেখছেন। স্কুল ও খেলার মাঠে ২১ জন নিরীহ মানুষের প্রাণহানির এই ঘটনা ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার চলমান সংঘাতকে আরও প্রতিহিংসাপরায়ণ ও ভয়াবহ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এদিকে তেহরান সরকার জানিয়েছে, হামলার তথ্য ও প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এনএনবাংলা/পিএইচ


আরও পড়ুন
বন্ধের সুযোগ নিয়ে আল-আকসা মসজিদে পশু বলির পরিকল্পনা ইহুদি সেটেলারদের
দেশে জ্বালানির সংকট নেই, এপ্রিল মাসে সরবরাহ স্বাভাবিক থাকবে: যুগ্মসচিব
হরমুজ প্রণালি না খুলেই যুদ্ধ শেষ করতে চান ট্রাম্প, কাজটি স্থগিত রাখতে চান ভবিষ্যতের জন্য: ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল