Thursday, April 2nd, 2026, 1:53 pm

ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে নিহত হয়েছেন ২০ জন

 

সদ্য বিদায়ী ঈদুল ফিতরের আগে ও পরে ১৫ দিনে (১৪–২৮ মার্চ) দেশে মোট ৩৭৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৯৮ জন নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ ঈদযাত্রা চলাকালে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২০ জন করে প্রাণ হারিয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৪৬ জন নারী ও ৬৭ জন শিশু রয়েছে বলে জানিয়েছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

এছাড়া জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল), ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এ সময় আহত হয়েছেন দুই হাজারের বেশি মানুষ।

একই সময়ে নৌপথে ১১টি দুর্ঘটনায় ৯ জন নিহত, ২৩ জন আহত এবং ২ জন নিখোঁজ হয়েছেন। অন্যদিকে রেলপথে ২৯টি দুর্ঘটনায় ৪১ জন নিহত এবং ২০৯ জন আহত হয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক প্রতিবেদনে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সাইদুর রহমান এসব তথ্য জানান। ৯টি জাতীয় দৈনিক, ১৭টি জাতীয় ও আঞ্চলিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।

যানবাহনভিত্তিক নিহতের চিত্র

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে। মোটরসাইকেল চালক ও আরোহী নিহত হয়েছেন ১১৬ জন। এছাড়া বাসযাত্রী ৪১ জন, ট্রাক-পিকআপে ১৩ জন, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ২০ জন, থ্রি-হুইলার যাত্রী (ইজিবাইক, সিএনজি, অটোরিকশা ও অটোভ্যান) ৫০ জন নিহত হয়েছেন।

এছাড়া স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহনের (নসিমন, ভটভটি, মাহিন্দ্র, টমটম) যাত্রী ৯ জন এবং বাইসাইকেল আরোহী ২ জন নিহত হয়েছেন।

দুর্ঘটনার স্থান ও ধরন

পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, দুর্ঘটনার মধ্যে ১১৫টি জাতীয় মহাসড়কে, ১৬১টি আঞ্চলিক সড়কে, ৪৮টি গ্রামীণ সড়কে, ৪২টি শহরের সড়কে এবং ৭টি ফেরিঘাটসহ অন্যান্য স্থানে ঘটেছে।

দুর্ঘটনার ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৯৬টি মুখোমুখি সংঘর্ষ, ১৫২টি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে, ৪৯টি পথচারীকে চাপা দিয়ে, ৬৮টি পেছন থেকে আঘাতের কারণে এবং ৮টি অন্যান্য কারণে ঘটেছে।

সম্পৃক্ত যানবাহনের সংখ্যা

মোট ৬১৮টি যানবাহন এসব দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। এর মধ্যে বাস ৯১টি, ট্রাক ৬৪টি, কাভার্ডভ্যান ২১টি, পিকআপ ২৪টি, ট্রাক্টর ৪টি, ড্রাম ট্রাক ৭টি, মাইক্রোবাস ১১টি, প্রাইভেটকার ৩২টি এবং অ্যাম্বুলেন্স ২টি ছিল।

এছাড়া মোটরসাইকেল ১৫৩টি, থ্রি-হুইলার ১৩৮টি, স্থানীয়ভাবে তৈরি যানবাহন ৪২টি, বাইসাইকেল ৪টি এবং ১৬টি অজ্ঞাত যানবাহন দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।

অঞ্চলভিত্তিক পরিস্থিতি

চট্টগ্রাম বিভাগে সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটেছে। এ বিভাগে ৯৩টি দুর্ঘটনায় ৭৪ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে কম ১২ জন নিহত হয়েছেন।

একক জেলা হিসেবে চট্টগ্রাম জেলায় সর্বোচ্চ ৪৩টি দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত হয়েছেন।

ঈদযাত্রার সামগ্রিক চিত্র

এবারের ঈদুল ফিতরে রাজধানী ঢাকা থেকে এক কোটির বেশি মানুষ গ্রামে গেছেন এবং দেশের অভ্যন্তরে প্রায় চার কোটি মানুষ যাতায়াত করেছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আগাম ছুটি এবং দীর্ঘ ছুটির কারণে ট্রেন ছাড়া সড়ক ও নৌপথে ভিড় তুলনামূলক কম ছিল।

তবে অব্যবস্থাপনার কারণে সড়ক, রেল ও নৌপথে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছে ফাউন্ডেশনটি।

মর্মান্তিক কয়েকটি দুর্ঘটনা

ঈদকালীন সময়ে কয়েকটি বড় দুর্ঘটনা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সদরঘাটে দুই লঞ্চের মাঝে চাপা পড়ে ২ জন নিহত, জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে ড্রামসেতু উল্টে ৪ শিশু নিহত, কুমিল্লার পদুয়ারবাজারে রেলক্রসিংয়ে বাসে ট্রেনের ধাক্কায় ১৪ জন নিহত এবং দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে যাত্রীবাহী বাস নদীতে পড়ে ২৬ জন নিহত হওয়ার ঘটনা দেশবাসীকে শোকাহত করেছে।

এসব দুর্ঘটনার পেছনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে এগুলোকে ‘কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ হিসেবে উল্লেখ করেছে রোড সেফটি ফাউন্ডেশন।

গত বছরের সঙ্গে তুলনা

২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের আগে-পরে ১১ দিনে ২৫৭টি দুর্ঘটনায় ২৪৯ জন নিহত হয়েছিলেন। সে সময় প্রতিদিন গড়ে ২৩.৩৬টি দুর্ঘটনায় ২২.৬৩ জন নিহত হন।

এ বছর ১৫ দিনের ঈদযাত্রায় প্রতিদিন গড়ে ২৪.৮৬টি দুর্ঘটনায় ১৯.৮৬ জন নিহত হয়েছেন। ফলে গত বছরের তুলনায় দুর্ঘটনা বেড়েছে ৬.৪২ শতাংশ, তবে প্রাণহানি কমেছে ১২.২৪ শতাংশ।

তবে এই প্রাণহানি কমাকে প্রকৃত উন্নতির সূচক হিসেবে দেখছে না সংস্থাটি। তাদের মতে, পরিবহন খাতে কোনো ব্যবস্থাপনাগত উন্নতি হয়নি। মূলত জ্বালানি সংকটের কারণে মোটরসাইকেলের ব্যবহার কমে যাওয়ায় প্রাণহানি কিছুটা কমেছে।

এছাড়া মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আক্রান্তদের মধ্যে ৫৩ শতাংশের বয়স ১৪ থেকে ২০ বছর এবং কিশোর-যুবকদের বেপরোয়া মোটরসাইকেলের ধাক্কায় ৯ জন পথচারী নিহত হয়েছেন।

প্রস্তাবিত করণীয়

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রতিবেদনে বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে এর অধীনে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ডিটিসিএ পরিচালনা করা এবং এসব প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

এছাড়া মোটরযানে আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি বাধ্যতামূলক করা, মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সড়ক থেকে অপসারণ, রাজধানীতে রুট রেশনালাইজেশন করে আধুনিক বাসসেবা চালু এবং দক্ষ চালক তৈরিতে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।

স্বল্পগতির যানবাহনের জন্য মহাসড়কে সার্ভিস রোড নির্মাণ, সব রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য জাতীয় বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার সুপারিশও করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, টেকসই পরিবহন কৌশলের আওতায় সড়ক, রেল ও নৌপরিবহনকে একীভূত করে একটি অভিন্ন যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গঠন এবং সময়োপযোগী নীতিমালা প্রণয়ন করা হলে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এনএনবাংলা/পিএইচ