চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল জোটের মধ্যকার সংঘাত জ্বালানি উৎপাদন, তেলবাহী ট্যাংকার চলাচল এবং আরব উপসাগরীয় অঞ্চলের সামুদ্রিক নিরাপত্তাকে বড় ঝুঁকিতে ফেলেছে। হরমুজ প্রণালি অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে তীব্র জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দেশের নির্ভরশীলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
জ্বালানিবিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত বিশ্বের অন্তত ২০ শতাংশ এলএনজি সরবরাহ বর্তমানে ঝুঁকির মুখে। সাম্প্রতিক হামলার কারণে কাতার এলএনজি উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাংলাদেশ আগে থেকেই কাঠামোগত ঘাটতির মুখে রয়েছে।
গবেষণা সংস্থা সানেম তাদের বিশ্লেষণে দেখিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মূলত চারটি চ্যানেলের মাধ্যমে প্রভাবিত করছে—জ্বালানি, রেমিট্যান্স, বাণিজ্য এবং সরবরাহ ব্যবস্থা। এর মধ্যে জ্বালানি খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
সানেম ‘গ্লোবাল ট্রেড অ্যানালাইসিস প্রজেক্ট’ (GTAP)-এর কম্পিউটেবল জেনারেল ইকুইলিব্রিয়াম মডেল ব্যবহার করে বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, যদি বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৪০ শতাংশ এবং এলএনজির দাম ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী—
- প্রকৃত জিডিপি কমতে পারে প্রায় ১.২%
- রপ্তানি কমতে পারে প্রায় ২%
- আমদানি কমতে পারে প্রায় ১.৫%
- মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে প্রায় ৪%
- প্রকৃত মজুরি কমতে পারে প্রায় ১%
এতে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
খাতভিত্তিক প্রভাবেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে সানেম। তৈরি পোশাক খাতের উৎপাদন প্রায় ১.৫%, পরিবহন খাত প্রায় ৩% এবং কৃষি উৎপাদন প্রায় ১% কমতে পারে। জ্বালানি-নির্ভর শিল্প খাতে উৎপাদন কমার সম্ভাবনা প্রায় ২.৫%।
সানেম মনে করে, সরকারের নেওয়া পদক্ষেপগুলো এখন পর্যন্ত মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে। একদিকে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি ও জ্বালানি রেশনিংয়ের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে মাঠপর্যায়ে জ্বালানির প্রাপ্যতা নিয়ে বাস্তবতার সঙ্গে সরকারি বক্তব্যের অমিল দেখা যাচ্ছে।
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সানেম বেশ কিছু সুপারিশ দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
- নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বৃদ্ধি
- নেট-মিটারিং সহজ করা
- শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে রুফটপ সোলার প্রকল্প সম্প্রসারণ
- নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ
এছাড়া করমুক্ত সরঞ্জাম, স্বল্প সুদে ঋণ এবং জীবাশ্ম জ্বালানির ভর্তুকি নবায়নযোগ্য খাতে স্থানান্তরের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনার ওপর জোর দিয়ে সানেম বলেছে, বহুজাতিক চুক্তি ও দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার মাধ্যমে তেল ও এলএনজি আমদানি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি একটি ‘কৌশলগত জাতীয় জ্বালানি মজুত’ গড়ে তোলাও জরুরি।
বর্তমান সংকট মোকাবিলায় কিউআর কোডভিত্তিক জ্বালানি রেশনিং, শিল্প উৎপাদন অফ-পিক সময়ে স্থানান্তর এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সময় সীমিত করার মতো পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
মধ্যমেয়াদে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান জোরদার করারও সুপারিশ করেছে সানেম।
এনএনবাংলা/


আরও পড়ুন
নববর্ষের অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে শেষ করার নির্দেশ, ফানুস-আতশবাজি নিষিদ্ধ
বৈশাখে আসছে প্রীতম-জেফার জুটির ‘তুমি আমি শুধু’
হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ৭ শিশুর মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ৬৭৪